দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬ বাতিল করেছে সরকার। যা নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের তালিকায় কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি সংশোধন বা সংযোজন-বিয়োজন করা যেতো। অথবা বাদ দিয়ে ২০১৬ সালের নিয়মে ফিরে যেতে পারতো। কিন্তু তা না করে সরকার ৩২ বছর আগের ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। ওই সময়ের অনেক ওষুধ বাতিল হয়ে গেছে। নতুন ওষুধ বাজারে এসেছে। বিষয়টিকে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের একচেটিয়া ফায়দা লোটার কৌশল হিসেবে দেখছেন দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা।
এদিকে ওষুধ প্রশাসন বলছে, দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শিগগিরই নতুনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গত ২৯শে জুন ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। ওষুধ প্রশাসন জানিয়েছেন, মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যেন জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না হয়। একইসঙ্গে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখার বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
গত ৩রা আগস্ট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬ বাতিল সিদ্ধান্ত হয় মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে। কারণ হিসেবে বলা হয়, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তালিকা ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়াই প্রণীত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একাধিক রিটও করা হয়। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এ কারণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আগের মতো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এরপর ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় তালিকা ১১৭টি ওষুধ যুক্ত করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধ নিয়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়। যদিও তা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। এরপর ২০১৬ সালের নীতিতে ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২৮৫টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নীতিতে বাড়িয়ে ২৯৬টি করা হয়। বর্তমানে ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরেছে সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে অত্যাবশ্যকীয় তালিকা থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওষুধের নাম বাদ পড়েছে। আবার সে সময়ের অনেক ওষুধ বাতিল হয়ে গেছে। যা সাধারণ মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়াও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কর্তৃত্বও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাটি পুরোপুরি বাতিল করে এক ধাক্কায় ১৯৯৪ সালের তালিকায় ফিরে যাওয়া কোনো সাধারণ আইনি ত্রুটি নয়। এটি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের একচেটিয়া ফায়দা লোটার একটি কৌশল। নতুন তালিকায় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হতো। যা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফায় বাধা দিতো। ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে নীতিনির্ধারকদের এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, যাতে সংস্কার ৩২ বছর পুরোনো নিয়মে গিয়ে ঠেকে। যেখানে ওষুধের মূল্য এবং নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের অনুকূলে থাকে। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের তালিকায় কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি সংশোধন বা সংযোজন-বিয়োজন করা যেতো। অথবা এই তালিকা বাতিল করে জনগণের মতামত নিতে গণশুনানি করতে পারতো। তারপর নতুন জনবান্ধব তালিকা তৈরি করা যেতো। কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা তা করেননি। তারা জনগণের স্বাস্থ্য বা পকেটের সুরক্ষার চেয়ে ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখতেই বেশি আগ্রহী।
এ প্রসঙ্গে আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, দেশের ওষুধ খাতের নীতিমালা ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে অনেক ওষুধ বাতিল হয়ে গেছে। নতুন ওষুধ এসেছে। মানুষের যে সমস্ত রোগ আগে অত্যাবশ্যক ছিল না সেসব রোগ এখন অত্যাবশ্যক চলে এসেছে। কাজেই ৩২ বছর আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নয়। যেখানে ওষুধের দাম কমার কথা, সেখানে তা আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাজার সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ওষুধের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। সুদূরপ্রসারী চিন্তা বা পরিকল্পনা ছাড়া বাজারকে খোলাবাজারে ছেড়ে দেয়া হঠকারিতা হবে।
এ প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ১৯৯৪ সালে ৬০০ থেকে ৭০০টি ওষুধের মধ্যে সরকার ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বাজারে ১৪০০টির মতো ওষুধ রয়েছে। তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা দীর্ঘ হতে পারে। ইতিমধ্যে এ বছরের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হবে। মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যেন জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না হয় এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।
