সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের ভালোবাসায় অমর এক জীবন

জন্মদিনে বেগম খালেদা জিয়া

সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের ভালোবাসায় অমর এক জীবন

ফন্ট সাইজ:

আজ ১৫ই আগস্ট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামী পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু কিছু মানুষের প্রস্থান তাদের অস্তিত্বের অবসান ঘটায় না; বরং তাদের কর্ম, সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের ভালোবাসা ইতিহাসের পাতায় আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। বেগম খালেদা জিয়াও তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তার জীবন ছিল একইসঙ্গে একজন নারীর ব্যক্তিগত বেদনা, একজন মায়ের অসীম ত্যাগ এবং একজন রাজনৈতিক নেত্রীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং পরবর্তীতে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথটি কখনোই তার জন্য সহজ ছিল না। এই পথ তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে স্বামী হারানোর কষ্ট, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন, কারাবরণ, অপমান, অসুস্থতা এবং নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতির অগ্রভাগে: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল তার নিজের কোনো পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। একজন স্ত্রী হিসেবে স্বামীকে হারানোর শোক এবং একজন মা হিসেবে দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা- সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজেকে দেশের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৮২ সালের ৩রা জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ই মে বিএনপি’র চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে আটক করা হয়েছে, নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে; কিন্তু তিনি তার অবস্থান থেকে সরে যাননি।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের হাতে তাকে আটক হতে হয়। তার নেতৃত্বে আন্দোলন ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর প্রবল গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আন্দোলনে তার দৃঢ় ভূমিকার কারণেই তিনি মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এই পরিচয় শুধু একটি রাজনৈতিক উপাধি ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবরণ এবং নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার ইতিহাস। ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আপস না করে রাজনৈতিক আদর্শে অটল থাকার যে মানসিকতা, সেটিই তাকে মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদা দেয়।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী: ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নারী হিসেবে দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ ছিল শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বাংলাদেশের নারীদের জন্যও এটি ছিল একটি অনুপ্রেরণার ঘটনা। পরবর্তীতে তিনি আরও দু’বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সরকারগুলোর সময়ে শিক্ষা, নারী শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তার নেতৃত্বে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি কার্যক্রম এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ক্ষমতার পাশাপাশি ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শুধু ক্ষমতায় থাকা বা নির্বাচনে
জয়লাভের ইতিহাস দিয়ে মূল্যায়ন করলে তার জীবনের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাবে। তার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি যে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন, সেই সময়ে দেশের বিভিন্ন সংকট ও জাতীয় ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। দেশের মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রশ্নে তিনি বারবার কথা বলেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন মূলত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরই ইতিহাস।

এক-এগারো: দেশ ছাড়েননি খালেদা জিয়া: বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময়। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তিনি দেশ ছাড়েননি। তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। সেসময় তিনি বলেছিলেন- ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা।’
এই বক্তব্যের মধ্যেই যেন তার দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক সংকটের সময় দেশের মানুষকে ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়া তার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

সেই সময় তার সামনে ছিল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন। কিন্তু তিনি দেশ ছাড়ার পথ বেছে নেননি। বরং তাকে এবং তার দুই সন্তানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান এবং রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকা ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।

একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? নিজের চোখের সামনে সন্তানদের কষ্ট, কারাবরণ ও নির্যাতন দেখা- এ এক অসহনীয় যন্ত্রণা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত এই দুঃখকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কারণ হতে দেননি।