প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরের তোড়জোড়

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরের তোড়জোড়

ফন্ট সাইজ:

ভারত যেকোনো মূল্যে তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে আতিথেয়তা দিতে চায়। দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের শেষভাগে অথবা সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নয়াদিল্লিতে একটি দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনা করছে। কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই দ্রুত সফর গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন, জ্বালানি চুক্তি এবং ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ সুগম করবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দ্রুত ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে। ঢাকার সূত্রগুলো দুই পক্ষের মধ্যে চলমান আদান-প্রদানে সন্তোষ প্রকাশ করেছে, তবে তারা ভারতকে সতর্কও করেছে। ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার দল আওয়ামী লীগের অব্যাহত কর্মকাণ্ড দ্বিপক্ষীয় নতুন উদ্যোগগুলোর ওপর ছায়া ফেলার সম্ভাবনা রাখে।

নয়াদিল্লির সূত্রগুলোও বলেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। কারণ ভারতীয় নেতৃত্বের জন্য বছরের অবশিষ্ট চার মাসে অন্যান্য সফর ও ব্যস্ততা নির্ধারিত থাকায় কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ শিগগিরই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় পক্ষের মধ্যে এই আদান-প্রদান শুরু হয় গত সোমবার, ১০ই আগস্ট যখন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আয়োজিত ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ফলে তৈরি হওয়া উত্তেজনার পটভূমিতে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং ঘটনাটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে। এমন পরিস্থিতিতে ৯ই আগস্ট, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসেন। বাংলাদেশের মন্তব্যের জবাবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেকে হাসিনার অনুষ্ঠানে ভারতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান।

তারা জানায়, ভারত বাংলাদেশের সংবিধিবদ্ধ সরকারের বিরুদ্ধে ওই অনুষ্ঠানে করা মন্তব্যগুলোকে অনুমোদন করে না। মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আরও স্পষ্ট করেছেন যে, ব্রিক্‌স সম্মেলনের জন্য জনাব রহমানকে আমন্ত্রণের পাশাপাশি ভারত ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের কথাও বলেন। দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার পর ১০ই আগস্ট, ২০২৬ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে, দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লি সফর করেন এবং মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্রিফ করেন। জানা গেছে যে, ভারতীয় পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চলতি মাসের শেষের দিকে একটি দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণ নিশ্চিত করবে।

এর মধ্যে রয়েছে পানি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান, জ্বালানি চুক্তি, ভিসা সুবিধা এবং ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশের বস্ত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়া। ভারতের কূটনৈতিক পক্ষ থেকে তারেক রহমান সরকারকে এটিও জানানো হয়েছে, আপনি যদি হাসিনাকে নিয়ে আটকে থাকেন, তবে আপনি বাস মিস করবেন। এটি বোঝা যাচ্ছে যে, জনাব রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রতি বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ রয়েছে; তবে ব্রিক্‌স সম্মেলনে অংশগ্রহণে ততটা আগ্রহ নেই। কারণ বাংলাদেশ ব্রিক্‌সের সদস্য নয় এবং এর ফলে সদস্য দেশগুলোর নেতাদের মূল গোলটেবিল বৈঠকে তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা কম। তবে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে যে, চলতি মাসের শেষের দিকে দিল্লিতে হাসিনার আওয়ামী লীগের সদস্যদের একটি নতুন বৈঠকের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এটি আলোচনার ইতিবাচক ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশি ক্ষোভের মুখে পড়ে কর্মকর্তারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে ভারত জড়িত ছিল না। ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শীতল সম্পর্কের মধ্যদিয়ে গেছে। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদের নেতৃত্বাধীন ১৫ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পানি বণ্টন এবং কৌশলগত বিষয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা করেনি।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ের পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি যখন জনাব রহমান শপথ গ্রহণ করেন, তখন ভারত তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরবর্তীতে, জনাব রহমান দেশের ভেতরে একাধিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় সংকটের সঙ্গে মিলে যাওয়া অবনতিশীল জ্বালানি পরিস্থিতি, একটি হামের প্রাদুর্ভাব যা শত শত শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কঠোর চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ আগামী ২০শে আগস্ট একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে এবং ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী, জ্যেষ্ঠতম ক্যাবিনেট সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন রাষ্ট্রপতি হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর পর জনাব তারেক রহমানের হাতে কয়েকদিন সময় থাকতে পারে, যার মধ্যে সফরটি নির্ধারিত হতে পারে।