করদাতাদের আয়কর বিবরণী দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) এবং টিআইএনসংবলিত সিস্টেম জেনারেটেড প্রত্যয়নপত্র যাচাইয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব কাগজপত্রের যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করতে কর অঞ্চলভিত্তিক পরিবীক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ৬ আগস্ট এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে এনবিআর। এতে প্রতিটি কর অঞ্চলে উৎসে কর পরিবীক্ষণ টিম গঠন এবং রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র ও টিআইএন সনদ যাচাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি কর অঞ্চলের পরিদর্শন রেঞ্জ-১-এর কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক, পরিদর্শন রেঞ্জ-২, ৩ ও ৪-এর কর্মকর্তাদের যুগ্ম আহ্বায়ক, উপকর কমিশনার, সহকারী কর কমিশনার বা অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনারকে টিম লিডার এবং কর পরিদর্শকদের সদস্য করে পরিবীক্ষণ টিম গঠন করতে হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎসে কর কর্তন এবং রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা টিআইএনসংবলিত প্রত্যয়নপত্র দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের দায়িত্ব একই কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলে, উৎসে কর পরিবীক্ষণের দায়িত্বে থাকা টিমকেই এসব বিষয় যাচাইয়ের দায়িত্ব দিতে হবে।
এনবিআরের নির্দেশনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো সেবাগ্রহীতাকে সেবা দেওয়ার আগে তার সর্বশেষ কর বছরের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা পিএসআর অবশ্যই যাচাই করতে হবে। এ জন্য প্রতিটি পিএসআর অনলাইনে এনবিআরের ই-ট্যাক্স ব্যবস্থার পিএসআর যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে, টিআইএনসংবলিত সিস্টেম জেনারেটেড প্রত্যয়নপত্রের সত্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের নির্ধারিত আয়কর ওয়েবসাইট অথবা বারকোড স্ক্যানারের মাধ্যমে প্রত্যয়নপত্র যাচাই করতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ করদাতা কোনো সেবা নিতে গিয়ে পিএসআর বা টিআইএন সনদ দাখিল করলে শুধু কাগজপত্র দেখে তা গ্রহণ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনলাইনে তথ্য যাচাই করে কাগজপত্রের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অর্থবছরের শুরুতেই অর্থ আইন ও আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৪সহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে সেবা বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
পাশাপাশি এনবিআরের সঙ্গে অসহযোগিতা করলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩১৮ অনুযায়ী দণ্ড এবং নির্দেশনা অনুসরণ না করলে ধারা ২৬৪ অনুযায়ী জরিমানার বিধান রয়েছে—এ বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করতে হবে। একই সঙ্গে আইন ও নির্দেশনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা চালানোর কথা বলা হয়েছে।
পিএসআর ও টিআইএন সনদ যাচাইয়ের কার্যক্রম শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত পরিবীক্ষণের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর।
এ জন্য বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত ছকে পিএসআর ও টিআইএন সনদ যাচাই-সংক্রান্ত স্বাক্ষরিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ‘কর জরিপ ও পরিদর্শন শাখায়’ প্রতি মাসের প্রথম তিন কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারা অনুযায়ী কোম্পানি, ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ ও ট্রাস্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ যাচাইয়ের সময় পিএসআর এবং টিআইএনসংবলিত প্রত্যয়নপত্রও পরীক্ষা করতে হবে।
এতে শুধু ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাই নয়, ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও আয়কর বিবরণী দাখিলের প্রমাণ এবং টিআইএনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই আরও কঠোর হবে।
নির্দেশনায় আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪২ ধারার বিধানও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পিএসআর উপস্থাপনে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য উৎসে করের হারের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর আদায় করতে হবে।
ফলে সেবা গ্রহণের আগে পিএসআর দাখিল এবং এর সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি করদাতা ও সেবা প্রদানকারী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনবিআর স্পষ্ট করে দিয়েছে, বোর্ডের দেওয়া ক্ষমতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ এখতিয়ারের মধ্যেই পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এখতিয়ারবহির্ভূত কোনো পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
একই সঙ্গে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এনবিআরে তথ্য পাঠানো থেকেও বিরত থাকা যাবে না। নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের এই নতুন নির্দেশনার ফলে আয়কর বিবরণী দাখিলের প্রমাণপত্র ও টিআইএনসংবলিত সনদের যাচাই প্রক্রিয়া আরও আনুষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভুয়া বা অসত্য পিএসআর ও টিআইএন সনদ ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা নেওয়ার সুযোগ কমানোর পাশাপাশি করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নেও নজরদারি বাড়বে।
