বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বাহিনীকে আরও আধুনিক, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাহিনীর প্রায় ৬০ লক্ষ সদস্যের অস্তিত্ব এখন সুনির্দিষ্ট ও ডাটাবেজভুক্ত। গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও প্লাটুন পর্যায়ের সদস্যদের তথ্যকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে বাহিনীর সব সদস্যকে ডাটাবেজভুক্ত করার মাধ্যমে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, বাহিনীর ডিজিটাল রূপান্তর এখন দৃশ্যমান। নিরাপত্তা দায়িত্বে সদস্য মোতায়েন, সদস্যদের তথ্য সংরক্ষণ, বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। আনসার-ভিডিপি জব পোর্টালের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ে মনিটরিং সিস্টেম ও ডাটা সার্ভিস ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংস্কার ও রূপান্তরের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আনসার-ভিডিপি একাডেমি, গাজীপুরের সফিপুরে, আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাড়ে চার লক্ষাধিক নতুন তরুন সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ প্রশিক্ষণ শুধু নির্বাচন বা উৎসবকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনের জন্য নয়; যুদ্ধকালীন বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতেও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী জনবলের বহুমুখী কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। গত দুই বছরে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, ধরন ও সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সতেজকরণ প্রশিক্ষণও জোরদার করা হয়েছে। বাহিনীর নিরাপত্তা দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গত দুই বছরে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের সেবার মানসিকতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্হাপনা জোরদার করা হয়েছে। একইসাথে দীর্ঘদিনের দুর্দশা হিসেবে চাকুরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য রেষ্টপ্রথা বাতিলের প্রয়োজনীয় সংস্কার, ব্যবস্থাপনা ও জনবল সমন্বয় কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সদস্যদের বেতন, রেশন ও অন্যান্য প্রাপ্যতা যথাসময়ে নিশ্চিত করা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের পেশাগত দক্ষতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে চাকুরী সমাপ্তিতে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অবসর গমনকালীন গ্র্যাচুয়িটি ফান্ড প্রাপ্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষন সমন্বয় করে দুর্যোগ ও যুদ্ধকালীন ভুমিকা পালনে পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যরা তৃণমূল পর্যায়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। পরিবেশ দুষন প্রতিরোধ, বৃক্ষরোপণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ, কৃষিকাজে সহায়তা, স্বেচ্ছাশ্রম এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের ভিডিপি ক্লাবগুলোকে সঞ্জীবন কর্মসূচির আওতায় পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা, স্বেচ্ছাশ্রম ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বনির্ভর সমাজ গঠনে ভিডিপি-টিডিপি সদস্যদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। এভাবেই বাহিনীর তৃণমূল শক্তিকে জাতীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, বর্তমানে কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক ধাপ অতিক্রম করেই যোগ্য মেধাবী প্রার্থীরা চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হচ্ছেন। নিয়োগে কোনো অবৈধ আচরণ, দুর্নীতি বা দালালির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে দক্ষতা, জ্ঞান, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাহিনীর বর্তমান সৈনিকরা নির্বাচিত হচ্ছেন। মহাপরিচালক বলেন, বাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নে একাডেমিতে বহুমুখী নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, সদর দপ্তরের ওয়েলফেয়ার শাখাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং মাঠপর্যায়ে সদস্যদের কল্যাণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিগত কোরবানির সময়ে চামড়া সংরক্ষণে বাহিনীর সুবৃহৎ স্বেচ্ছাসেবীদের প্রত্যক্ষ ভুমিকা ও সক্ষমতা তৈরির যে নতুন ধারা চালু হয়েছে তা আগামীতে সংস্কার কার্যক্রমের সুফল দ্রুততার সাথে দৃশ্যমান হবে।
বাহিনীকে আরও জনবান্ধব, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কার ও রূপান্তরের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাহিনীর প্রায় ৬০ লক্ষ সদস্যের সক্ষমতাকে দেশের নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার আরও উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন বাহিনী প্রধান। উক্ত মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদ, আনসার- ভিডিপি একাডেমির কমান্ড্যান্ট (ভারপ্রাপ্ত) উপমহাপরিচালক মোঃ সাইফুল্লাহ্ রাসেল সহ অন্যান্য কর্মকর্তা, কর্মচারী, সদস্য-সদস্যাবৃন্দ।
