ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত থাকার কারণে রেকর্ড সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। জাহাজটিতে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন সামরিক পরিবারের সদস্য ও মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য।
দুটি প্রধান সামরিক সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকনে থাকা কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা, কঠিন জীবনযাপন এবং মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে সংকটজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আব্রাহাম লিংকনের প্রায় ৫ হাজার সদস্যের ক্রু বর্তমানে সমুদ্রে অবস্থানের নবম মাসে রয়েছে। এর মধ্যে টানা ২৫০ দিন তারা কোনো বন্দরে নোঙর করেনি, যা আধুনিক সময়ে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য রেকর্ড দীর্ঘ সময় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সান দিয়েগোতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক আবেগঘন টাউন হল বৈঠকে জাহাজে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য।
স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক নারী জানান, সেদিন তার স্বামী তাকে মেসেজ করে লিখেছিলেন, “তিনি আশা করছেন, আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না ওঠেন।”
ইতিমধ্যে পরিবারগুলোর উদ্বেগ সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বৈঠকে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাওসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এক নারী হাং কাওকে বলেন, নৌবাহিনী ও নেতৃত্বের মধ্যে “আস্থার সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে”।
চলমান মোতায়েনের সময় লিংকনে আত্মহত্যার চেষ্টা ঠেকানোর কয়েকটি ঘটনার বিস্তারিতও প্রকাশ করেছে নেভি টাইমস।
আনাবেল লোমা নামের এক নারী সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, সমুদ্রে অবস্থানের মেয়াদ বারবার বাড়তে থাকায় তার স্বামী একপর্যায়ে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বলেন, সে ভয় পেয়েছে। সে মনে করছে, তাকে অসম্মানজনকভাবে বরখাস্ত করা হবে। শুধু অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ার এভাবে শেষ হয়ে যাবে।
আরেক নাবিকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী লিংকনে ঘটে যাওয়া পৃথক একটি ঘটনায় এক সহকর্মীকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকান। তিনি ওই ব্যক্তিকে ধরে জাহাজের ডেকে ফিরিয়ে আনেন।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিনও লিংকনে থাকা নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্স-এ জাহাজটির অবস্থাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সেখানে রয়েছে ছত্রাকধরা গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে অচল লন্ড্রি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকট। খাবারের অবস্থাও ভয়াবহ বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে একটি খাবারে ছিল মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি টর্টিলা। এমনকি সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টেরও ঘাটতি ছিল।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রোও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। সাবেক আর্মি রেঞ্জার হিসেবে আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ক্রো বলেন, লিংকনে থাকা সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারের ওপর চাপ “সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বাড়ছে”।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। লিংকন গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রথমে জাহাজটির গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।
এমএস নাউ-এর তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ৫ হাজারের বেশি সদস্যের ক্রু মাত্র দুই দিন স্থলভাগে কাটানোর সুযোগ পেয়েছে। ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে। তাদের মোতায়েনের মেয়াদ প্রথমে মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলমান যুদ্ধের কারণে তা একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে।
এপ্রিল মাসেও বিমানবাহী রণতরীটির জীবনযাত্রার নিম্নমান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সে সময় নিম্নমানের ও সীমিত খাবারের ছবি প্রকাশ্যে আসে। পাশাপাশি পানির সংকট, ছত্রাকধরা গোসলখানা এবং নষ্ট লন্ড্রি মেশিনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে “আরও কিছু ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ সপ্তাহে হেগসেথের ওই মন্তব্যের জবাব দেন মাইক লেভিন।
তিনি বলেন, এই নারী-পুরুষরা দেশের সেবা করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। তাদের দেশের কাছ থেকে অন্তত গরম পানি, সচল টয়লেট এবং যথাযথ খাবার পাওনা। হেগসেথ সেটুকুও নিশ্চিত করতে পারছেন না, অথচ তাদের পরিবারের সদস্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মিথ্যাবাদী বলার সাহস করছেন।
লিংকনে নাবিকদের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবর নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে জানতে চাওয়া হলে পরে একজন নৌ কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন যে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর “গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে”, নৌবাহিনী তা জানে এবং তাদের সহনশীলতা ও ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞ।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, লিংকনের প্রত্যেক নাবিকের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নৌবাহিনীর অগ্রাধিকার। কমান্ডের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার রিপোর্টে কোনো বৃদ্ধি শনাক্ত করা হয়নি।
মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি “সমন্বিত সহায়তা নেটওয়ার্ক” রয়েছে। এর মধ্যে জাহাজে থাকা মোতায়েনকালীন মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বিষয়ক পরামর্শদাতা ও চ্যাপলিনরাও রয়েছেন।
নৌ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। তবে তার দাবি, জাহাজ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিরবচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুযোগ থাকার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সক্রিয় দায়িত্বে থাকা মার্কিন নৌসেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ অবশ্য নতুন নয়। গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নাবিকদের ওপর থাকা বিশেষ ধরনের চাপ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সবচেয়ে সাধারণ চাপের কারণ হিসেবে প্রচণ্ড শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অপর্যাপ্ত মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা উঠে আসে।
গবেষকরা মোতায়েন থাকা নাবিকদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেন, প্রায় অর্ধেক নাবিক সমুদ্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে- বিশেষ করে নৌবাহিনীর মধ্যেও আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ায় জাহাজে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ উন্নত করার উদ্যোগ “জরুরি ভিত্তিতে” নেওয়া প্রয়োজন।
