লেভিটের বিকল্প খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কেন কঠিন?

সিএনএনের বিশ্লেষণ

লেভিটের বিকল্প খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কেন কঠিন?

ফন্ট সাইজ:

ডনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে কথা বলার জন্য তার খুব বেশি কাউকে প্রয়োজন হয় না। আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে সরব প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে ট্রাম্প প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সাক্ষাৎকার এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মাধ্যমে নিজের বার্তা পৌঁছে দেন। তবু প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের বিদায় ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বুধবার লেভিটের পদ ছাড়ার ঘোষণা আসে। তার বিদায়ের পরই স্পষ্ট হবে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা দলের কতটা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
তবে লেভিট কেবল একজন মুখপাত্র ছিলেন না। তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক মানসিকতা ও তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) দর্শন খুব ভালোভাবে বুঝতেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে আক্রমণ চলছে, তাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে গণমাধ্যমও ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সাংবাদিকদের নিয়মিত আক্রমণ ও বিদ্রূপের মাধ্যমে লেভিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রচলিত সাংবাদিকতার ভেতরের বিভাজনও সামনে এনেছেন।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেভিট জানান, গত ১ মে তার দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় “নিরবচ্ছিন্ন সময়, শক্তি ও মনোযোগ” দেওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের প্রাপ্য মা হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ট্রাম্পও অবশ্য লেভিটের বিদায়ের ধাক্কা কিছুটা সামলানোর চেষ্টা করেছেন। ২৮ বছর বয়সী লেভিটকে তিনি তার “সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন” হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন, পদ ছাড়ার পরও তিনি বাইরের পরামর্শক হিসেবে ট্রাম্পকে সহযোগিতা করবেন।

ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া কতটা কঠিন?
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া সহজ কোনো দায়িত্ব নয়। তার প্রশাসনে ‘বার্তার ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখাই যেন এক ধরনের স্ববিরোধিতা। প্রেসিডেন্ট নিজেই পরের মুহূর্তে কী বলবেন, তা অনেক সময় কেউ জানেন না।
তিনি মুহূর্তের মধ্যে নীতি পরিবর্তন করতে পারেন, নিজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মন্তব্য করতে পারেন, এমনকি নিজের আগের বক্তব্যও অস্বীকার করতে পারেন।
গণমাধ্যমকে কীভাবে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়, ট্রাম্প সেটিও ভালোভাবেই জানেন। কয়েক দশক ধরে তিনি সাংবাদিকদের কখনো আক্রমণ করেছেন, কখনো প্রশংসা করেছেন, আবার কখনো নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
১৯৮০-এর দশকের নিউইয়র্কের ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমে বিতর্কিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও তারকা হিসেবে নিজের যে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, সেটিও তিনি রাজনৈতিক জীবনে কাজে লাগিয়েছেন। গণমাধ্যমের সবসময় নতুন শিরোনামের প্রয়োজন- এই বিষয়টি তিনি বুঝেছিলেন এবং সেটিকে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণের সময় ট্রাম্পের সংঘাতপ্রিয়তা, প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রতি অবজ্ঞা এবং বিতর্কিত মন্তব্য করার প্রবণতা এক ধরনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তিনি প্রচলিত গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নিজের ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
তাই প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের আদৌ আর কোনো প্রেস সেক্রেটারির প্রয়োজন আছে কি না।

লেভিটকে সহজে প্রতিস্থাপন করা কঠিন
লেভিটের দক্ষতার সমন্বয় খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না। ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পের ‘এমএজিএ’ ভাষা তার চেয়ে সাবলীলভাবে আর কেউ বলতে পারেন না- এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তার নিয়মিত ব্রিফিংগুলো নীতির ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা বিদেশি নেতাদের উদ্দেশে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেয়ে ট্রাম্পের মতোই দৃঢ়তা ও সংঘাতের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল।
ট্রাম্পের সমর্থকেরা লেভিটকে অত্যন্ত পছন্দ করেন। বিখ্যাত সাংবাদিকদের আক্রমণ করার তার ধরন ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনী প্রচারের সময়কার বিদ্রোহী সুরের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে তিনি প্রায়ই প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য বা মানসিকতা নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতেন। ফলে সাংবাদিকেরাও অনেক সময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক নাটকের পার্শ্বচরিত্রে পরিণত হতেন।
গত মাসে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে ট্রাম্পের পাশে বসেছিলেন লেভিট। এপ্রিলে এক বন্দুকধারী ওই অনুষ্ঠানে ঢোকার চেষ্টা করার পর অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ট্রাম্প সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। লেভিটের দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই ঘটনাটি এখন তার মেয়াদের এক ধরনের প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন ফ্লাইট এবং সেই যাত্রায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের ‘ডিকয়’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না- এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই লেভিট তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
লেভিটের মেয়াদকে মনে রাখা হবে প্রেসিডেন্টকে জবাবদিহির আওতায় রাখার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ধারণাকে দুর্বল করার সময় হিসেবে। তার দপ্তর দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন সংবাদদাতা সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত প্রেস পুল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানে কারা প্রবেশ করবেন এবং কারা এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ করবেন, সে বিষয়েও তার দপ্তর সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে।

একই সঙ্গে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক, পডকাস্টার ও এমএজিএ-সমর্থক ব্যক্তিত্বদের স্থায়ী প্রেস কোরের অংশ করা হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রতি নরম মনোভাবাপন্ন প্রচারকদের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে তথাকথিত ‘উদারপন্থী এলিট’ গণমাধ্যমের একচেটিয়া প্রভাব কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানান।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি ছিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) হোয়াইট হাউসের কয়েকটি প্রেস ইভেন্টে নিষিদ্ধ করা। ট্রাম্পের নির্দেশে লেভিটের দপ্তর এ সিদ্ধান্ত নেয় এবং এপি’র একজন প্রতিবেদককে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকেও বাদ দেওয়া হয়।
এর আগে ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। এপি তাদের স্টাইল গাইড পরিবর্তন করে সেই নতুন নাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

লেভিটের ব্রিফিংগুলোও দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মিডিয়া টিমের প্রচারিত তথাকথিত ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’-ও তুলনামূলকভাবে নিরীহ মনে হতে পারে। তিনি অনেক সময় ব্রিফিং শুরু করতেন ট্রাম্পের সাফল্যের অতিরঞ্জিত প্রশংসা দিয়ে। তার বক্তব্য অনেকটা রক্ষণশীল টেলিভিশনের প্রাইম-টাইম অনুষ্ঠানের মতো হয়ে উঠেছিল।

ট্রাম্পের সঙ্গে গণমাধ্যমের সংঘাত নতুন নয়
প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গেই গণমাধ্যমের কোনো না কোনো পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কও অনেক সময় টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। বারাক ওবামার সহযোগীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধও ছিল। জো বাইডেনের প্রেস দপ্তরও সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশেষভাবে কঠোর আচরণের জন্য সমালোচিত হয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের আমলে সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক ভূমিকা এর আগে কখনো এত বড় হুমকির মুখে পড়েনি। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমস ওয়াকশ বলেন, লেভিট পারিবারিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন- এ বিষয়ে তার আন্তরিকতা নিয়ে তিনি সন্দেহ করেন না। তবে তিনি বলেন, ট্রাম্পের মুখপাত্র হওয়া কঠিন একটি কাজ, যেখানে প্রতিদিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হয়।
তার মতে, লেভিটের উত্তরাধিকার হবে হোয়াইট হাউস ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে দেওয়া।

লেভিট চলে গেলে কী হবে?
ক্যামেরার সামনে লেভিটের ব্রিফিংগুলো যতটা সংঘাতপূর্ণ ছিল, ক্যামেরার বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক সময় ততটাই সহযোগিতামূলক ছিল। তিনি সাধারণত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় দিতেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি প্রেসিডেন্টের পাশে থাকার সুযোগ পেতেন। সাংবাদিকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো এবং একজন শীর্ষ মুখপাত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ত।

লেভিটের বিদায়ের পর তাই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, একজন অনিয়মিত ও প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প যদি তার অভ্যন্তরীণ বলয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কাউকে নতুন প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ না দেন, তাহলে লেভিটের মতো প্রশাসনের প্রতি এমন স্বাভাবিক ও কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সাধারণত হোয়াইট হাউসগুলো এক বা একাধিক ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারিকে ভবিষ্যতের শীর্ষ মুখপাত্র হিসেবে তৈরি করে। কিন্তু লেভিটের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উত্তরসূরি পরিকল্পনা নেই। ফলে জল্পনা তৈরি হয়েছে- ট্রাম্প হয়তো প্রেস সেক্রেটারির পুরো দায়িত্ব নিজেই নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে লেভিট সম্ভবত দীর্ঘদিন একজন নায়িকা হিসেবেই থাকবেন। তার প্রভাব দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের পরও টিকে থাকতে পারে। কারণ হোয়াইট হাউসের পরবর্তী প্রশাসনগুলো প্রায়ই আগের প্রশাসনের কৌশল অনুসরণ করে।

আর ভবিষ্যতের কোনো প্রেসিডেন্ট- তিনি ডেমোক্র্যাটই হোন কিংবা রিপাবলিকান- সংবাদমাধ্যমের হাতে আগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অনিচ্ছুক হতে পারেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার মনে হচ্ছে, তিনি এমনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন যেন ভবিষ্যতে কিছুই আর আগের মতো না থাকে।
এই অভিযাত্রায় তার পাশে ছিলেন একজন বিশ্বস্ত ও কার্যকর সহযোগী- ক্যারোলিন লেভিট।