অস্ট্রেলিয়ার চাকরি-ভিসার নামে প্রতারণার ফাঁদ, প্রলোভনে সর্বস্বান্ত বাংলাদেশিরা

অস্ট্রেলিয়ার চাকরি-ভিসার নামে প্রতারণার ফাঁদ, প্রলোভনে সর্বস্বান্ত বাংলাদেশিরা

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে একটি চক্র। ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ওয়ার্ক ভিসা, আইইএলটিএস ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া, শতভাগ ভিসার নিশ্চয়তা, এমন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশি যুবক থেকে মধ্যবয়সী মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
কমলা ও আপেলবাগানে চাকরি, ড্রাইভিং পেশায় উচ্চ বেতন, দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে।

ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে অস্ট্রেলিয়ায় নিশ্চিত চাকরি, দ্রুত ভিসা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়। আগ্রহী ব্যক্তিরা যোগাযোগ করলে নিজেদের আন্তর্জাতিক রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসা কনসালট্যান্ট বা অভিবাসন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেন প্রতারকেরা। পরে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমোর মাধ্যমে যোগাযোগ করে শুরু হয় টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশ্বাস অর্জনের জন্য তাদের দেখানো হয় কথিত ভিসার কপি, বিমান টিকিট, অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত ব্যক্তিদের ছবি, অফিসের ভিডিও, লাইসেন্স ও বিভিন্ন নথি। এরপর ফাইল খোলা, প্রসেসিং, মেডিকেল, ভিসা অনুমোদন ও ‘এম্বাসি ফি’সহ নানা খাতে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া হয়।
অর্থ নেওয়ার পর একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ করে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ ও ব্যবহৃত ফোন নম্বর।

কমলা-আপেল বাগানের চাকরির টোপ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কমলা ও আপেলবাগানে শ্রমিক নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রাইভিং পেশায় আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির সুযোগের কথাও প্রচার করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর চাকরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
এসব বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করে অনেকে জমানো অর্থ, পরিবারের সঞ্চয় এমনকি ঋণ করে টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ দেওয়ার পর শুরু হয় নানা টালবাহানা। একপর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন কথিত এজেন্টরা।

ভুয়া ভিসা দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন
প্রতারণার ক্ষেত্রে নতুন কৌশলও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অন্য ব্যক্তির অস্ট্রেলিয়ার ভিসার কপি সংগ্রহ করে সেটি সম্পাদনা করে নতুন আবেদনকারীর নামে তৈরি করা হচ্ছে। পরে সেই ভুয়া পিডিএফ পাঠিয়ে বলা হচ্ছে, আপনার ভিসা অনুমোদন হয়ে গেছে। এখন টাকা পরিশোধ করলে মূল কপি পাঠানো হবে। এভাবে জাল নথি দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জনের পর ধাপে ধাপে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী জামিল আহমদ বলেন, প্রথমে ফেসবুকে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক পারমিটের একটি বিজ্ঞাপন দেখেন। বিজ্ঞাপনে স্বল্পমূল্যে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করার পর বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাকে বিশ্বাস করানো হয়। পরে বিভিন্ন খরচের কথা বলে টাকা দাবি করা হয়।
আরেক ভুক্তভোগী কামরান আহমদ বলেন, তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বড় অঙ্কের বেতনের চাকরি এবং পরে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তার ভাষ্য, ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দেবে, আমাকে কিছু করতে হবে না। শুধু পাসপোর্ট ও আইডি কার্ড জমা দিতে হবে। পরে তাকে একটি ভিসার ফটোকপি পাঠিয়ে বলা হয় ভিসা অনুমোদন হয়ে গেছে এবং টাকা পাঠাতে হবে। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন ভিসার কপিটি জাল।

প্রবাসীদের কাছেও আসছে ভিসা যাচাইয়ের ফোন
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী শিপন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রায়ই তার কাছে অস্ট্রেলিয়ার কমলা বা আপেল বাগানের কাজের ভিসা সম্পর্কে জানতে ফোন আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে অনেকে তার কাছে ভিসার সত্যতা জানতে চান।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র সাধারণ মানুষের সরলতা ও বিদেশ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া প্রবাসীরাও টার্গেটে
অভিযোগ রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরাও এই প্রতারণার অন্যতম লক্ষ্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পরে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে শুরু হয় অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবিদুর রহমান জানান, দুবাই থেকে এক প্রবাসী তাকে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক ভিসার বিষয়ে ফোন করেন। ওই প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত অস্ট্রেলিয়ার ড্রাইভিং ভিসা ও আপেল বাগানে কাজের ভিসার বিজ্ঞাপন দেখে তার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি ওই ব্যক্তিকে এসব বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, এসব বিজ্ঞাপন ভুয়া এবং একটি চক্র মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজনের সমন্বয়ে চক্রটি এসব কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। নতুন নতুন পেজ, গ্রুপ ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে তারা প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জমি বিক্রি, ঋণ করে টাকা
বিদেশে উন্নত ভবিষ্যতের আশায় অনেক বাংলাদেশি জমি বিক্রি, ঋণ কিংবা পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় থেকে অর্থ সংগ্রহ করছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের আগেই প্রতারণার শিকার হয়ে হারাচ্ছেন সেই অর্থ। আর্থিক ও পারিবারিক ক্ষতির পাশাপাশি অনেকেই পড়ছেন মানসিক হতাশায়।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। কোনো নিয়োগদাতা বা এজেন্টের দাবির ওপর নির্ভর না করে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, ভিসার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক ভিসা ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যেসব বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর পেছনে বাংলাদেশে থাকা কিছু এজেন্সি, মধ্যস্থতাকারী ও দালালের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নেওয়াই যথেষ্ট নয়, বাংলাদেশে বসে যারা এসব বিজ্ঞাপন প্রচার ও অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
কমিউনিটি নেতারা এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশি কমিউনিটি হেল্প সেন্টারের অ্যাডমিন সিএইচ মাহবুবুর রহমান প্রান্ত বলেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। লোভনীয় এসব বিজ্ঞাপন যাচাই না করে কোন ধরনের টাকা লেনদেন না করার আহ্বান জানান।

সতর্ক করেছে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিসা প্রতারণা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরও সতর্ক করেছে। দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া মাইগ্রেশন এজেন্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করে থাকে। কেউ অস্ট্রেলিয়ার ভিসা নিশ্চিত করে দিতে পারে না। দ্রুত ভিসা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের অগ্রিম অর্থ দাবি করাও প্রতারণার সতর্কসংকেত।
দপ্তরটি ভিসা-সংক্রান্ত সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট বা অস্ট্রেলিয়ান আইনজীবীর মাধ্যমে সেবা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সন্দেহজনক ভিসা প্রতারণার ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, চাকরির প্রস্তাব, ভিসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট নথি যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে সরাসরি অর্থ না দিয়ে অনুমোদিত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ায় উন্নত জীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার এই চক্র বন্ধ করতে বাংলাদেশে বসে যারা বিজ্ঞাপন প্রচার, আবেদন প্রক্রিয়া ও অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কার্যক্রম তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।