গ্রীষ্ম মৌসুমের শেষ সময়ে আবারো তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে যুক্তরাজ্য। চলতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। রাজধানী লন্ডন সহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রার ৩০ডিগ্রি সেলসিয়াস ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠানামা করছে।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল এবং মিডল্যান্ডসের বিস্তীর্ণ এলাকায় অ্যাম্বার এক্সট্রিম হিট ওয়ার্নিং অ্যাম্বার মাত্রার স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে দেশটির হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি। বিভিন্ন অঞ্চলে জারি করা এই অ্যাম্বার এক্সট্রিম হিট ওয়ার্নিং শুক্রবার ( ১৪ আগস্ট) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে ।
পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। দাবানল, খরা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ ও মোকাবেলায় সতর্ক রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এনিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জরুরি কোবরা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বুধবার। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম।
১০ ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, চলমান তীব্র গরমে অগ্নিনির্বাপণকর্মী, কৃষক ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএস কর্মীরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। জনগণকে নিরাপদ রাখা, পানির সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।
আজ (বৃহস্পতিবার) মিডল্যান্ডস, পূর্ব ইংল্যান্ড, লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডসহ ইয়র্কশায়ার ও হাম্বার এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে জানানো হয়েছে ।
এর আগে ২৬ জুন নরফোকের লিংউডে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে এটি ২০০৩ সালের পর আগস্ট মাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিন হতে পারে। ২০০৩ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল।
এদিকে মেট অফিস আরো জানিয়েছে, চলতি বছর যুক্তরাজ্যে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যার রেকর্ড ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। রোববার ছিল বছরের ৩৫তম দিন, যেদিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে বা ছাড়িয়েছে। চলতি তাপপ্রবাহের মধ্যে ইংল্যান্ডের আরও বেশ কিছু এলাকা খরার আওতায় এসেছে। সোমবার দেশটির ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকাকে খরাপ্রবণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ খরা পরিস্থিতির আওতাধীন এলাকায় বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ পানির ব্যবহার সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মুখে রয়েছেন।
খরার পাশাপাশি দাবানলও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ন্যাশনাল ফায়ার চিফস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৯৬৬টি দাবানলের ঘটনায় দমকল বাহিনীকে কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টের প্রথম ১০ দিনেই ১৮৫টি এবং জুলাইয়ে ৪৫৮টি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে হ্যাম্পশায়ারের নিউ ফরেস্টে একটি বড় দাবানল রোববার থেকে জ্বলছে। রিংউডের কাছে এ৩১ মহাসড়কে একটি ভ্যানে আগুন লাগার পর সেখান থেকে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীরা কাজ করছেন।
বুধবারের কোবরা বৈঠকে পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা ছাড়াও পরিবেশ সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন ।
তীব্র গরমে সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়ভেট কুপার জানিয়েছেন, গ্রীষ্মকালীন অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলায় এনএইচএসকে শীতকালীন চাপের মতো আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়লে তা মোকাবিলায় পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহান্ত থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করতে পারে। তবে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের মতো চরম তাপমাত্রা না হলেও কিছু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে।
মেট অফিস মঙ্গলবার জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্ম যুক্তরাজ্যের রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মে পরিণত হওয়ার পথে। বর্তমানে গড় তাপমাত্রা ১৬ দশমিক ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত বছর স্থাপিত রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল ক্রমেই উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনাও বাড়ছে। কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হতে পারে।
এদিকে প্রচন্ড গরমের সময়টাতে বিশেষ করে দিনের বেলাতে অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
