ট্রাইব্যুনালে আশিকের জবানবন্দি

দুই মাস গুম রেখে নির্যাতনের অভিযোগ

ট্রাইব্যুনালে আশিকের জবানবন্দি

ফন্ট সাইজ:

২০১৬ সালে প্রায় দুই মাস গুম করে রেখে নির্যাতন এবং পরে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ করেছেন রংপুরের চিকিৎসক ডা. আশিক উল আকবর। অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে হত্যা বা আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনানসহ চার আসামির আইনজীবী।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আশিক উল আকবরের সাক্ষ্যের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। আসামিপক্ষের জেরা চলমান রয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৬ই আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন স্টেট ডিফেন্সের আইনজীবী ইশরাত জাহান।
প্রায় দুই মাস গুম করে নির্যাতনের অভিযোগ: জবানবন্দিতে ডা. আশিক উল আকবর বলেন, ২০১৬ সালের ২৩ মে রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে মামার বাসায় থাকা অবস্থায় ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়। মাথায় কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে মারধর করে একটি কালো মাইক্রোবাসে তোলা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তাকে একটি কক্ষে প্রায় ৬০ দিন ২৪ ঘণ্টা চোখ বেঁধে ও দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হয়। দিনে মাত্র দুইবার টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। নির্ধারিত সময়ের বেশি হলে মারধর করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আশিক বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে চাপ দেওয়া হয়। অস্বীকার করায় মারধরের পর হাতের সঙ্গে গামছা বেঁধে একটি হুকের মাধ্যমে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে দুই কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তারা যা বলবে তা স্বীকার করার কথা জানান আশিক। এরপর তাকে একটি মুদ্রিত কাগজ দেখে সাদা কাগজে লিখতে বাধ্য করা হয়। একই সময়ে তার ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নেওয়া হয়। পরে তার চোখের রেটিনা, ১০ আঙুলের ছাপ এবং লিখিত বক্তব্যের ভিডিও রেকর্ড করা হয় বলে জানান তিনি। দীর্ঘ সময় চোখ বাঁধা থাকার কারণে তার ডান চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও দাবি করেন আশিক। ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তির পর ৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের কাছে গেলে তার ডান চোখে রেটিনার অস্ত্রোপচার করা হয় বলে জানান তিনি। প্রায় দুই মাস পর তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় চুল কেটে ও দাড়ি সেভ করে পুনরায় হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর ‘র‌্যাব’ লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয় বলে জানান আশিক।
তার দাবি, প্রায় দুই মাস পর প্রথমবারের মতো দিনের আলো দেখতে পান তিনি। এরপর তাকে আরও তিনজনের সঙ্গে র‌্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্র, গোলাবারুদ, নাট-বল্টু ও বই সাজিয়ে তাদের পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়। পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে ওই ছবির মিল পান বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি। এরপর তাকে টঙ্গী থানায় নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাকে ও আরও তিনজনকে আসামি করে তিনটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় তাদের জেএমবি সদস্য হিসেবে দেখানো এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের দাবি করা হয় বলে জানান আশিক।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, তাকে গুম করে রাখার সময় তার বাবা জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। পরে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়। মামলা প্রত্যাহার না করায় পরবর্তী সময়ে ডেমরা ও আশুলিয়া থানার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া ও নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আশিক জানান, ডেমরা থানার মামলায় ২০১৮ সালে তিনি অব্যাহতি পান। টঙ্গী থানার একটি মামলা ২০১৭ সালে হাইকোর্টে স্থগিত হয়। আর আশুলিয়া থানার মামলায় ২০২৬ সালের জুনে তিনি বেকসুর খালাস পান। প্রায় দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস কারাগারে থাকার পর হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্ত হন তিনি। এ কারণে তার চিকিৎসাশিক্ষা তিন বছর পিছিয়ে যায় এবং ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন বলে জানান।
‘হত্যার নির্দেশ দেননি সাদ্দাম-ইনান’: এদিকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ যুক্তিতর্কে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের পক্ষে বক্তব্য দেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি দাবি করেন, তার চার মক্কেল ছাত্র-জনতাকে হত্যা বা আহত করার কোনো নির্দেশ দেননি। প্রসিকিউশন নির্দেশনা, উসকানি ও প্ররোচনার পক্ষে অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দাখিল করলেও পরশ, নিখিল, সাদ্দাম ও ইনান হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইশরাত জাহান বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হলেই দেশের সব নেতাকর্মীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে—এমনটা বলা ঠিক নয়। ছাত্রলীগের সদস্য ফরম পূরণ করেও অনেকে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
‘যারা নিজেদের রাজাকার দাবি করে, তাদের আমরা শেষ দেখে নেব’—প্রসিকিউশনের অভিযোগে থাকা এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আইনজীবী বলেন, ‘শেষ করা’ বলতে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বোঝানো হয়েছে, কাউকে হত্যা করা নয়। নিখিলের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, প্রসিকিউশনের দাখিল করা কোনো ভিডিও বা প্রমাণে তাকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়নি। সাক্ষীরাও এমন কথা বলেননি। এর আগে ১২ আগস্ট সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করে প্রসিকিউশন। আগামী ১৬ আগস্ট ইশরাত জাহান তার বাকি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন।

মামলার সাত আসামি হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।