বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং বলিউডের এক অভিনেত্রী খুনের রোমহর্ষক কাহিনী

ফ্লাশব্যাক

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং বলিউডের এক অভিনেত্রী খুনের রোমহর্ষক কাহিনী

ফন্ট সাইজ:

২০০০ সালের ২৭ মার্চ রাতে মুম্বইয়ের জুহুরে বিশাল বাংলোয় ছিলেন বলিউডের অভিনেত্রী প্রিয়া রাজবংশ। একসময় চলচ্চিত্র নির্মাতা চেতন আনন্দের সঙ্গে তিনি এই বাড়িতেই থাকতেন। চেতন ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে ঘিরেই প্রিয়া তার জীবনের বড় একটি অংশ গড়ে তুলেছিলেন। জানা যায়, সেদিন রাতে প্রিয়া এক গৃহকর্মীকে দুধ গরম করে আনতে বলেছিলেন। গৃহকর্মী কিছুক্ষণের জন্য সেখান থেকে চলে যান। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন, প্রিয়া মৃত। অভিনেত্রীর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকারী কীভাবে বাড়িতে ঢুকেছিল বা কীভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল, তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় ছিল- যে বাড়ির প্রায় প্রতিটি কোণ তার পরিচিত ছিল, সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রিয়া রাজবংশের এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডকে পিছন ফিরে দেখার চেষ্টা করেছে এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, একসময় ভারতীয় লোককথার অন্যতম করুণ নায়িকা ‘হীর’ চরিত্রে অভিনয় করে অমর হয়ে গিয়েছিলেন প্রিয়া। ৬৩ বছর বয়সে নিজের জীবনেও যেন এক নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হলেন তিনি- তার দীর্ঘদিনের প্রেমের গল্পের প্রতীক হয়ে থাকা সেই বাড়িতেই। পুলিশ যখন তার জীবনের শেষ কয়েক মিনিটের ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখতে শুরু করল, সন্দেহের তীর বাংলোর বাইরের কারও দিকে খুব বেশি দূর এগোয়নি।

১৯৩৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিমলায় ভেরা সুন্দর সিং হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন প্রিয়া রাজবংশ। তিনি একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন। অভিনেতা কমলজিৎ সিংয়ের সঙ্গেও তার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। কমলজিৎ ছিলেন অভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমানের স্বামী। পড়াশোনা শেষ করে প্রিয়া লন্ডনে চলে যান এবং রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে থাকাকালীন তার একটি ছবি চলচ্চিত্র নির্মাতা চেতন আনন্দের কাছে পৌঁছেছিল বলে জানা যায়। চেতন ছিলেন দেব আনন্দ ও বিজয় আনন্দের বড় ভাই। চেতন তখন ‘হীর রাঞ্জা’ চলচ্চিত্রের জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। প্রিয়ার ছবিতে তিনি যেন সেই নারীকে দেখতে পেয়েছিলেন, যাকে তিনি চরিত্রটির জন্য কল্পনা করেছিলেন।

তবে প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়। এর পরিবর্তে ১৯৬৪ সালের যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হকিকত’ দিয়ে হিন্দি সিনেমায় অভিষেক ঘটে প্রিয়ার। চেতন আনন্দ পরিচালিত ছবিটি সফল হয় এবং পরবর্তী সময়ে হিন্দি সিনেমার উল্লেখযোগ্য যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকে। এই ছবিই প্রিয়ার জীবনের এমন এক ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কের সূচনা করে, যা পরবর্তী কয়েক দশক তার জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

চেতন আনন্দের স্ত্রী ছিলেন উমা আনন্দ। তাদের দুই ছেলে- কেতন ও বিবেক। প্রিয়ার সঙ্গে চেতনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে চলে এলেও তারা কখনো বিয়ে করেননি। ‘হীর রাঞ্জা’ নির্মাণের সময় চেতন ও তার নায়িকা গভীরভাবে প্রেমে পড়ে যান। তাদের সম্পর্ক প্রচলিত সামাজিক রীতির বাইরে থাকলেও কয়েক দশক ধরে টিকে ছিল। প্রিয়া শুধু চেতনের জীবনসঙ্গী কিংবা চলচ্চিত্রের নায়িকা ছিলেন না; তার সৃজনশীল জগতের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিনয়ের বাইরেও চেতনের চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রিয়ার অবদান ছিল। অন্যদিকে চেতনও তার চলচ্চিত্রে প্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নিয়মিতভাবে কাস্ট করতেন।

প্রিয়ার অভিনয়জীবন ছিল অত্যন্ত বাছাই করা। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে তিনি মাত্র সাতটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং সবগুলোই পরিচালনা করেছিলেন চেতন আনন্দ। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আসে ১৯৭০ সালে ‘হীর রাঞ্জা’ ছবিতে। রাজ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে প্রিয়া হীর চরিত্রটির সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হয়ে যান যে পাঞ্জাবের সবচেয়ে চিরস্মরণীয় প্রেমকাহিনির করুণ নায়িকা হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি ‘হান্সতে জখম’ ও ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ ছবিতে অভিনয় করেন। পরে দেব আনন্দের বিপরীতে ‘সাহেব বাহাদুর’ এবং রাজেশ খান্না ও হেমা মালিনীর সঙ্গে ‘কুদরত’ ছবিতে অভিনয় করেন। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘হাথোঁ কি লাকিরেঁ’ মুক্তি পায় ১৯৮৬ সালে। এরপর তিনি প্রায় পুরোপুরি চলচ্চিত্রজগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

প্রিয়া কখনো প্রচলিত অর্থে বলিউডের তারকা হয়ে ওঠেননি। তার পাশ্চাত্য চেহারা এবং ইংরেজি প্রভাবিত উচ্চারণ সে সময়ের মূলধারার হিন্দি সিনেমায় বেশ ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হতো। শুধু চেতন আনন্দের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্তও তার চলচ্চিত্রের সংখ্যা সীমিত রেখেছিল। তবু ‘হীর রাঞ্জা’ তাকে বিস্মৃত হতে দেয়নি। বহু বছর ধরে প্রিয়ার জীবন আবর্তিত হয়েছে চেতন আনন্দকে ঘিরে। এরপর ১৯৯৭ সালে চেতন মারা যান। তার মৃত্যু শুধু প্রিয়াকে মানসিকভাবে একা করে দেয়নি; পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক এবং সম্পত্তি ঘিরে সমীকরণও বদলে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুহুর রুইয়া পার্কের যে বাংলোয় প্রিয়া বসবাস করতেন, সেটির সম্পত্তিতে প্রিয়া, কেতন ও বিবেক আনন্দের অংশীদারিত্ব ছিল। বাংলোটি বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন প্রিয়া- এমন খবরও পরে প্রকাশিত হয়। সম্পত্তি নিয়ে এই মতবিরোধ পরবর্তী সময়ে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। চেতনের মৃত্যুর তিন বছর পর সেই বাড়ির ভেতরেই খুন হন প্রিয়া। আর সেই বাংলোটিই খুব দ্রুত তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

যে রাতে প্রিয়া মারা যান, সেদিন তিনি মদ্যপান করছিলেন এবং তাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল বলে জানা যায়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি এক গৃহকর্মীকে গরম দুধ আনতে বলেন। গৃহকর্মী দুধ গরম করতে অল্প সময়ের জন্য চলে যান। ফিরে এসে তিনি দেখতে পান, প্রিয়ার ওপর হামলা হয়েছে। সমকালীন প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, তার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল এবং পরে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। এই অল্প সময়ের ব্যবধানই তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তোলে। বাইরের কোনো ব্যক্তি কি বিশাল বাংলোয় ঢুকে প্রিয়াকে খুঁজে বের করে, তার ওপর হামলা চালিয়ে এবং গৃহকর্মী ফিরে আসার আগেই পালিয়ে যেতে পারে?

পুলিশ প্রথমদিকে সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখে। পরে তদন্তের নজর ঘুরে যায় এমন ব্যক্তিদের দিকে, যারা বাড়ি এবং এর বাসিন্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানত। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কেতন আনন্দ ভিন্ন একটি বিবরণ দিয়েছিলেন। তিনি নাকি জানিয়েছিলেন, একটি পার্টিতে যাওয়ার জন্য প্রিয়ার প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় তিনি বাংলোয় ছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পরে পার্টির আয়োজকরা ফোন করে জানতে চান, প্রিয়া কেন এখনও সেখানে পৌঁছাননি। এরপর একজন গৃহকর্মীকে ওপরতলায় পাঠানো হলে তিনি প্রিয়ার মৃতদেহ দেখতে পান। তদন্তের সময় পুলিশ কর্মকর্তারা তার বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেতন অবশ্য পরিবারকে ঘিরে ওঠা সন্দেহ ও জল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং তদন্ত ও চিকিৎসাবিষয়ক প্রমাণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এদিকে ওই বাংলোতেই এর আগে আরেকটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রিয়ার হত্যার দুই বছর আগে কেতনের জার্মান স্ত্রী সেখানে আত্মহত্যা করেন। তদন্ত যত এগোয়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সম্ভাব্য হত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে সামনে আসতে থাকে। চেতন আনন্দ বিয়ে না করলেও তার সম্পত্তির একটি অংশ প্রিয়ার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। তার দুই ছেলেরও ওই সম্পত্তিতে অংশ ছিল। পরে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, বাংলো ও এর মালিকানা নিয়ে বিরোধই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ প্রিয়ার হাতে লেখা কিছু নোট এবং বিজয় আনন্দকে লেখা একটি চিঠির কথাও আদালতে তুলে ধরে। তাদের দাবি ছিল, এসব নথিতে হত্যার আগে প্রিয়ার ভয় ও উদ্বেগের বিষয়টি ফুটে উঠেছিল। তদন্তের একপর্যায়ে কেতন আনন্দ ও বিবেক আনন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় পরিবারের দুই কর্মী মালা চৌধুরী ও অশোক চিন্নাস্বামীকেও। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

২০০২ সালের ৩১ জুলাই মুম্বইয়ের একটি সেশন আদালত চার অভিযুক্তকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। মালা চৌধুরী ও অশোক চিন্নাস্বামীকে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অন্যদিকে কেতন আনন্দ ও বিবেক আনন্দকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য নয়, বরং প্রিয়াকে হত্যায় প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে আদালতের রায়েই মামলার শেষ হয়নি। ওই বছরের শেষদিকে কেতন ও বিবেক আনন্দ জামিন পান। ২০১১ সালে বোম্বে হাইকোর্ট তাদের দণ্ডের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনতে সম্মত হয়। এর ফলে প্রিয়ার মৃত্যুর ঘটনা একদিকে সেশন আদালতের রায়ে একটি পরিণতি পেলেও, অন্যদিকে মামলার শুরু থেকেই ঘিরে থাকা নানা প্রশ্নের পুরোপুরি অবসান হয়নি। সেশন আদালত একটি রায় দিয়েছিল। কিন্তু মামলাটি শেষ পর্যন্ত এক ধরনের অস্বস্তিকর রহস্যের আবহ বহন করে চলেছিল।

প্রিয়া রাজবংশ তার প্রজন্মের অধিকাংশ অভিনেত্রীর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। লন্ডনে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি হিন্দি সিনেমায় এসেছিলেন। বলিউডের বড় বড় তারকার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং হকিকত, হীর রাঞ্জা, হান্সতে জখম ও কুদরত-এর মতো চলচ্চিত্রে স্মরণীয় অভিনয় করেছেন। কিন্তু প্রচলিত তারকাখ্যাতির পেছনে তিনি কখনো ছোটেননি। বরং জীবনের একটি বড় অংশ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন চেতন আনন্দ, তার চলচ্চিত্র এবং দু’জনের তৈরি সেই বাড়িটিকে। চেতন মারা যাওয়ার পর সেই বাড়িই জড়িয়ে পড়ে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে। আর তিন বছর পর সেই বাড়ির ভেতরেই খুন হন প্রিয়া রাজবংশ- যে অভিনেত্রী একসময় পর্দায় হীরের করুণ প্রেমকাহিনিকে অমর করেছিলেন, তার নিজের জীবনও শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে।