এক্স-ফোর্সেস এসোসিয়েশনের সভাপতি লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সশস্ত্র সংগঠনগুলো চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, গুম, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে। পাহাড়ে ভয় কায়েম করে বছরে প্রায় ১ হাজার থেকে ১২শ’ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি করে এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। যাদের মধ্যে শুধু জেএসএস ও ইউপিডিএফ নামে দুটি সন্ত্রাসী বাহিনী গত ২ বছরে সংঘর্ষে প্রায় ২৮ হাজার ৫শ’ রাউন্ড গুলিবিনিময় করেছে। এতে ২ হাজার ১০৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ষড়যন্ত্র: সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ নামে এক্স-ফোর্সেস এসোসিয়েশন আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রায় ১৩ হাজার ২৯৪ বর্গকিলোমিটারের এই জায়গাটা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব, এনজিও এবং আইএনজিও এর সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা, প্রবাসী উপজাতিদের দেশবিরোধী প্রচারণা, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্শ্ববর্তী দেশের মদত এ সকল নানাবিধ কারণে পাহাড় অশান্ত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার, নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। তাদের মূল ব্যবসা চাঁদাবাজি। পাহাড়ের এমন কোনো খাত নেই, জায়গা নেই যেখানে চাঁদাবাজি হয় না। এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪১টি খাত থেকে প্রতি বছর ১ হাজার থেকে ১২শ’ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে। আর এই চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন অস্ত্র চোরাচালান সব কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে আত্মগোপনে থাকা মাইকেল চাকমার আবির্ভাব হওয়ার পর। গত এক বছরে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর আন্তঃকোন্দলে অন্তত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এক্স-ফোর্সেস এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ৯টি দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলোÑ ১. সশস্ত্র গোষ্ঠীকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করা। ২. শান্তিচুক্তি রিভিউ করা। ৩. ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, ইয়েন ইয়েন, প্রসীত বিকাশ খীসা, মাইকেল চাকমা, নাথান বম, সন্তু লারমাসহ অন্যদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের জন্য আইনের আওতায় আনা। ৪. পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল গোলযোগপূর্ণ এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন এবং বিজিবি’র বিওপি বাড়ানো। ৫. পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা জাতির সামনে স্পষ্ট করা। ৬. বাঙালিদের পাহাড়ে সমঅধিকার নিশ্চিত করা। ৭. উপজাতিরা পাহাড়ে এবং সমতলে জায়গা কিনতে পারলে বাঙালিরাও পাহাড়ে জায়গা কিনতে পারবে এই আইন প্রণয়ন করা। ৮. উপজাতিদের আয়করের অন্তর্ভুক্ত করা। ৯. বিদেশের মাটিতে যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা।
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিশেষ সহকারী রাশেদ খান বলেন, এই বাংলাদেশ আমাদের সকলের। আমাদের একটাই পরিচয় আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বাঙালি। এখানে কোনো আদিবাসী, উপজাতি, সমতল ভেদাভেদ নেই। তিনি বলেন, আমরা এখানে উত্থাপিত সব বিষয়ে একমত না হলেও এতটুকু বলতে পারি পাহাড়ে কিছুটা অশান্তি চলছে। তবে আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে কাজ করছে। শুধু পাহাড় নয় আমাদের দেশ যখনই সংকটে পড়েছে তখনই আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা হাল ধরেছেন। এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন এনসিপি’র কিছু নেতা বলছে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে। যদি এই সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয় তাহলে আমাদের এই পার্বত্য এলাকা আর আমাদের থাকবে না। দখল হয়ে যাবে। আমরা এটা কখনোই হতে দেবো না।
সেমিনারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করা হয়। তিনি বলেন, যারা আহাম্মকের মতো বলেনÑ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে, তাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, নিরাপত্তা নিয়ে ধারণাই নেই। ১৯৭২ সাল থেকেই আমাদের কোনো কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র লাভবান হতে এই পার্বত্য অঞ্চলকে তাদের হাতের মুঠোয় রাখার চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে আছেন আমাদের দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। তাদের যদি কোনো কাজে কেউ কষ্ট পাই সেটা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তবে সেগুলো না করে যারা পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করার কথা বলছেনÑ তারা অবশ্যই উদ্দেশ্যমূলক বলছেন।
