মৎস্য খাতকে কাঁচামালনির্ভরতা থেকে মূল্য সংযোজনের শিল্পে রূপান্তরের তাগিদ

মৎস্য খাতকে কাঁচামালনির্ভরতা থেকে মূল্য সংযোজনের শিল্পে রূপান্তরের তাগিদ

ফন্ট সাইজ:

দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের বড় জোগান আসে মাছ থেকে। খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও মৎস্য খাতের অবদান বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০.১৮ লাখ টন। একই সময়ে মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে চাষ থেকে। তবে বিপুল উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনো অনেক কম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, ট্রেসিবিলিটি, কোল্ডচেইন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রতি কেজি মাছে বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারলেই মৎস্য খাত বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি শিল্পে পরিণত হতে পারে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদেও তিনি দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে সরকার গবেষণা, সংরক্ষণ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। ইলিশ নিয়ে দেয়া বক্তব্যে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। মৎস্য খাতের জন্য বর্তমান সময়ে একটি বিষয় স্পষ্ট উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান, সংরক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি মৎস্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

মৎস্য খাতের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হতে পারে খামারিকে সরাসরি রপ্তানি মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা। সহজ শর্তে ঋণ, মৎস্যবীমা, মানসম্পন্ন পোনা, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মানও উন্নত করা সম্ভব।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম মৎস্য খাতকে খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ঋণ সুবিধা দিতে হবে। একই সঙ্গে মাছের পোনা ও খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। আরেক বিশ্লেষণে তিনি মৎস্য রপ্তানি বাণিজ্যে ই-ট্রেসিবিলিটির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পণ্যের উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি। তিনি জানান, কাঁচামাল নয়, মূল্য সংযোজিত পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশের বড় সুযোগ রয়েছে প্রক্রিয়াজাত মৎস্যপণ্যে। খোসা ছাড়ানো ও শিরা পরিষ্কার করা চিংড়ি, রান্নার জন্য প্রস্তুত মাছ, মাছের ফিলে, নির্দিষ্ট আকারে কাটা মাছ, মসলা বা আবরণ দেয়া মাছ, রান্না করা চিংড়ি এবং সরাসরি খাওয়ার উপযোগী পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম দিতে পারে। অর্থাৎ এক কেজি মাছ সাধারণ হিমায়িত পণ্য হিসেবে বিক্রি না করে যদি প্রস্তুত খাবার বা উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত পণ্যে রূপান্তর করা যায়, তাহলে রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ, হিমায়িত পরিবহন, মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, পরীক্ষাগার ও দ্রুত বন্দরসেবা দরকার। খামার থেকে সংগ্রহকেন্দ্র, সেখান থেকে কোল্ডচেইন, এরপর কারখানা ও বন্দর কোনো একটি স্তরে সমস্যা থাকলে পুরো রপ্তানি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তাপমাত্রা ও পানির গুণমানের পরিবর্তন মৎস্য উৎপাদনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই জলবায়ু-সহনশীল প্রজাতি, উন্নত হ্যাচারি, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও টেকসই চাষপদ্ধতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে উচ্চমূল্যের নতুন প্রজাতি, উন্নত পোনা এবং কম খাদ্যে বেশি উৎপাদন সম্ভব এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন জরুরি। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তবে মধ্যপ্রাচ্য, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর আমেরিকার অন্যান্য বাজারেও সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। প্রতিটি বাজারের ভোক্তার চাহিদা আলাদা। কোথাও হালাল ও রান্নার জন্য প্রস্তুত পণ্যের চাহিদা, কোথাও উচ্চমানের চিংড়ি বা মাছের ফিলের চাহিদা বেশি। তাই একই পণ্য সব বাজারে পাঠানোর বদলে বাজারভিত্তিক পণ্য তৈরি করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে ‘বাংলাদেশি মৎস্যপণ্য’ ব্র্যান্ড।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, মৎস্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মাননিয়ন্ত্রণ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার দায়িত্বের ধরনই তার ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু উৎপাদন যথেষ্ট নয়; খাদ্যনিরাপত্তা, ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগারে মান যাচাই এবং পণ্যের উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ই-ট্রেসিবিলিটি। অর্থাৎ একটি রপ্তানি চালানের মাছ কোন খামার থেকে এসেছে, কী খাদ্য ব্যবহার হয়েছে, কখন সংগ্রহ করা হয়েছে, কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় প্যাকেটজাত হয়েছে পুরো তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা। তিনি বলেন, আগামী দিনের মৎস্যচাষ হবে তথ্যনির্ভর। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পিএইচ ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা পরিমাপে কম খরচের সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ ও ডিজিটাল খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানো সম্ভব। রোগ শনাক্তকরণেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তির দাম। ক্ষুদ্র খামারির পক্ষে দামি যন্ত্র কেনা সম্ভব নয়। তাই সমবায়ভিত্তিক বা সেবা হিসেবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি অঞ্চলের কয়েকশ খামারি একটি ডিজিটাল পানি পরীক্ষা বা রোগ শনাক্তকরণ সেবার আওতায় এলে খরচও কমবে, সুবিধাও বাড়বে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) বিশ্লেষণ:

সাকিফ শামীম (সিএসইআরের চেয়ারম্যান, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের এমডি ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, এগ্রিকালচার শিল্প দক্ষতা পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট) সংস্থাটির বিশ্লেষণে আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৎস্যখাতের গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০.১৮ লাখ টন। একই সময়ে মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি মৎস্যখাতের বৈদেশিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই খাত কি তার বর্তমান অবস্থাতেই থেমে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি শিল্পে পরিণত হবে?

বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের বড় অংশ এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। চাষনির্ভর উৎপাদনও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে চাষ থেকে। অন্যদিকে রপ্তানিতে চিংড়ি এখনো প্রধান পণ্য। গলদা ও বাগদা চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া, সামুদ্রিক মাছ, কোরাল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত মাছেরও আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের মাছ ও মৎস্যপণ্য ইতিমধ্যে ৫০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন ও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ বাজার। কিন্তু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেই রপ্তানি বিপ্লব ঘটবে না। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার রূপান্তর। এই রূপান্তরের প্রথম শর্ত খামারিকে শক্তিশালী করা। দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি সীমিত পুঁজি, অনিশ্চিত বাজার ও নানা ঝুঁকি নিয়ে উৎপাদন করেন। মানসম্পন্ন পোনা ও খাদ্যের প্রাপ্যতা, রোগব্যাধি, উৎপাদন ব্যয়, পানির গুণমান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছুই তাদের উৎপাদন ও আয়কে প্রভাবিত করে। উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে খামারি বাজারদর নির্ধারণ করতে পারেন না; তাকে নির্ভর করতে হয় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর। এখানেই নীতির বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। খামারিকে শুধু উৎপাদক হিসেবে নয়, রপ্তানি মূল্যশৃঙ্খলের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, মৎস্যবীমা, মানসম্পন্ন পোনা, আধুনিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে কারিগরি পরামর্শ নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে খামারি ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাজারের অনিশ্চয়তা কমবে এবং রপ্তানিযোগ্য মান বজায় রাখাও সহজ হবে।

দ্বিতীয় পরিবর্তনটি হতে হবে প্রযুক্তিতে। আগামী দিনের মৎস্যচাষ হবে তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পিএইচ বা অ্যামোনিয়ার মাত্রা পর্যবেক্ষণে কম খরচের সেন্সর ব্যবহার করা যায়। স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ, ডিজিটাল খামার পর্যবেক্ষণ এবং রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি খাদ্যের অপচয় ও মাছের মৃত্যুহার কমাতে পারে। বড় খামারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহার করে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। তবে প্রযুক্তি মানেই দামি যন্ত্রপাতি নয়; ছোট খামারির নাগালের মধ্যে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়াই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির গুণমানের পরিবর্তন মাছ ও চিংড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে জলবায়ু-সহনশীল প্রজাতি, উন্নত হ্যাচারি, জীবাণু ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এবং টেকসই চাষপদ্ধতি এখন আর বিলাসিতা নয়। জলবায়ু অভিযোজনকে মৎস্যনীতির মূল অংশে আনতে হবে। এর পরের ধাপ রপ্তানি পণ্যের রূপান্তর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত বা হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি করে আসছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্য তৈরি হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে। খোসা ছাড়ানো ও শিরা পরিষ্কার করা চিংড়ি, রান্নার জন্য প্রস্তুত মৎস্যপণ্য, সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার, মাছের ফিলে, নির্দিষ্ট আকারে কাটা মাছ, মসলা বা আবরণ দেয়া মৎস্যপণ্য কিংবা রান্না করা চিংড়ি এসব পণ্যে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব। শুধু কাঁচামাল বা সাধারণ পণ্য বিক্রি না করে বাংলাদেশকে নিজস্ব ব্র্যান্ডের মৎস্যপণ্যের দিকে যেতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পণ্যের উৎস ও যাত্রাপথের পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোন খামারে মাছ উৎপাদিত হয়েছে, কী খাদ্য ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় তা প্যাকেটজাত করা হয়েছে এসব তথ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা, ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগারে মান যাচাই এবং শীতল সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন তাই রপ্তানি বৃদ্ধির পূর্বশর্ত। পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে একসঙ্গে দেখতে হবে। হ্যাচারি থেকে খামার, খামার থেকে সংগ্রহকেন্দ্র, সেখান থেকে শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, পরীক্ষাগার, প্যাকেটজাতকরণ এবং বন্দর কোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলে পুরো রপ্তানি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক হিমায়িত পরিবহন, স্থানীয় পর্যায়ে শীতল সংরক্ষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বন্দরসেবা তাই মৎস্য রপ্তানির অবকাঠামোগত ভিত্তি। একই সঙ্গে বাজারও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও মধ্যপ্রাচ্য, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর আমেরিকার বাজারে পণ্যের ধরন ও ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী আলাদা কৌশল প্রয়োজন। কোথাও হালাল সনদযুক্ত রান্নার জন্য প্রস্তুত মৎস্যপণ্যের চাহিদা থাকতে পারে, কোথাও উন্নতমানের চিংড়ি বা মাছের ফিলের। বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন ও বাংলাদেশের নিজস্ব মৎস্যপণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি এখন সময়ের দাবি। অর্থায়নেও পরিবর্তন প্রয়োজন। মাছচাষকে প্রচলিত কৃষিঋণের একটি উপখাত হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি ব্যবসায়িক মূল্যশৃঙ্খল। খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতের পরিবর্তে উৎপাদনক্ষমতা ও সম্ভাব্য আয়ভিত্তিক ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতল সংরক্ষণ ও পরীক্ষাগার অবকাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে। সরকারের ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা করা নয়, বরং ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। মৎস্য অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বেসরকারি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও খামারিদের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে উন্নত হ্যাচারি প্রযুক্তি, রোগ প্রতিরোধ, জলবায়ু-সহনশীল মাছচাষ এবং নতুন উচ্চমূল্যের প্রজাতি নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ খামার ব্যবস্থাপক, মৎস্যচাষ প্রযুক্তিবিদ, খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং রপ্তানি-মাননিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে।

এই রূপান্তরকে তিন ধাপে দেখা যেতে পারে। প্রথম ধাপে উৎপাদনব্যবস্থার সংস্কার খামারির অর্থায়ন, প্রযুক্তি, পোনা, খাদ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজন। দ্বিতীয় ধাপে প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতল সংরক্ষণ, পরীক্ষাগার, মান সনদ এবং পণ্যের উৎস শনাক্তকরণভিত্তিক শিল্প অবকাঠামো তৈরি। তৃতীয় ধাপে মূল্য সংযোজিত পণ্য, আন্তর্জাতিক বাজার বৈচিত্র্য এবং ‘বাংলাদেশি মৎস্যপণ্য’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মৎস্যখাতের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু কত বেশি মাছ উৎপাদন করা যাবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো এক কেজি মাছ থেকে কত বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা যাবে এবং সেই মূল্য সৃষ্টির কতটা অংশ খামারি, উদ্যোক্তা ও দেশের অর্থনীতিতে রাখা যাবে। উৎপাদন থেকে প্রযুক্তি, খামার থেকে কারখানা এবং স্থানীয় বাজার থেকে বৈশ্বিক ক্রেতা পুরো ব্যবস্থাকে একই রোডম্যাপে আনতে পারলে মৎস্যখাত কেবল খাদ্যনিরাপত্তার স্তম্ভ হয়ে থাকবে না; এটি হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি শিল্প। কাঁচামাল রপ্তানিকারক থেকে মূল্য সংযোজিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক মৎস্যশিল্পে উত্তরণই হতে পারে সেই রপ্তানি বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা।