ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে স্রেফ হাসিনা-কেন্দ্রিক করে লাভ নেই

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে স্রেফ হাসিনা-কেন্দ্রিক করে লাভ নেই

ফন্ট সাইজ:

ভারত-বিরোধী শক্তি বাংলাদেশে এতটাই উদ্বুদ্ধ যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তারা চাপ দিচ্ছে ‘ব্রিক্‌স’ শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ না নিতে– ভারতে না যেতে। তবে ১০ আগস্ট সোমবারের বৈঠকে তারেকের মানভঞ্জনে দীনেশ ত্রিবেদী সফল হলে তা দুই দেশের পক্ষেই মঙ্গল।

পাটিগণিতের সেই অঙ্কটা মনে আছে, যেখানে তেল চপচপে বাঁশে একটা বাঁদর কিছুটা উঠছে ও তারপর হড়হড়িয়ে খানিকটা নেমে যাচ্ছে? কিংবা সাপলুডো? মই বেয়ে ওঠার পর বেমক্কা চালে সাপের মুখে পড়ে ঝুপ-পতন? ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ইদানীং এইরকম ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যখন মনে হচ্ছে, এবার বোধহয় বোঝাপড়া ও আস্থা-ভরসার জায়গা ফিরে আসছে, ঠিক তখন এমন কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে যা সম্পর্কের উপর সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পর্দা টেনে দিচ্ছে। ফের নতুনভাবে শুরু করতে হচ্ছে সম্পর্ক গড়ার পর্ব। মানে, কেঁচে গণ্ডূষ।

শেখ হাসিনার বিদায় পর্ব থেকে ভারত-বিরোধিতায় বাংলাদেশ খইফোটা ফুটছিল। উফ, সে কী প্রবল রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা! মুহাম্মদ ইউনূস দেড় বছর ছড়ি ঘোরালেন, কিন্তু সম্পর্কের উন্নতিতে কুটোটা নেড়ে সাহায্য করেননি। নির্বাচন হল। হইহই করে জিতল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে থেকে এখনও পর্যন্ত তিনি এমন কিছু বলেননি, এমন কিছু করেননি, যা দু’-দেশের সম্পর্কের পক্ষে ক্ষতিকর। বঙ্গবন্ধু বা হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি। ভারতের সমালোচনাও করেননি। এই স্তম্ভে একাধিকবার লিখেছি, প্রায় দুই দশক পশ্চিমি গণতন্ত্রকে খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণের ফলে তারেক অনেক কিছু শিখেছেন। ঋদ্ধ হয়েছেন। পরিণত ও পরিশীলিত হয়েছেন, গণতন্ত্রের বিকাশে যা সহায়ক। বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারতও সম্পর্কের উন্নতিতে ধীরে ধীরে এগিয়েছে। তারেককে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগত চিঠি লিখে তাঁকে সফরে আসতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্পর্কটা দানা বাঁধছে না হাসিনার কারণে। ৫ আগস্ট যা হল, তাতে কেঁচে গণ্ডূষে কত কাল অতিবাহিত হবে, কেউ জানে না।

তারেক রহমানের পক্ষে হুট করে ভারত সফরে আসা যে সম্ভবপর নয় নয়াদিল্লি তা জানে। তারেকও জানেন, ভারতকে চটিয়ে ভারত-বিদ্বেষে ধুনো দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। ভারতের স্পর্শকাতরতাও তাঁর জানা। জানা বলেই প্রথম বিদেশ সফর হিসাবে বেজিংকে তিনি বেছে নেননি। মালয়েশিয়া গিয়েছেন, সেখান থেকে চিন। ভারত সেই সফরের দিকে নজর রাখলেও প্রকাশ্যে এমন কোনও মন্তব্য করেনি যাতে পারস্পরিক আস্থা ও ভরসায় ধাক্কা লাগে। বস্তুত, এই ক’-মাসে একটিবারের জন্যও সাউথ ব্লক থেকে এমন কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি কিংবা মন্তব্য করা হয়নি যাতে পরিস্থিতি বিগড়ে যায়। বরং দীনেশ ত্রিবেদীর মতো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার করে পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, কূটনৈতিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার উপর তিনি ভরসা রাখতে চান। দীনেশ ত্রিবেদীও কালক্ষেপ না করে জানিয়েছেন, ভিসা দেওয়ার সংখ্যা ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হবে। পর্যটক ভিসা দ্রুত চালু করা হবে। আরও বেশি ভিসা কেন্দ্র খোলা হবে। ভারত জানে, ভিসা-ই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির জিয়নকাঠি।

যৌক্তিকতা থাকুক না-থাকুক এ-কথা অনস্বীকার্য যে, ঢাকার কাছে এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর হাসিনার ভারত-বাস। যদিও তারা জানে, দুনিয়া ওলটপালট হয়ে গেলেও হাসিনাকে ভারত ঢাকার হাতে তুলে দেবে না। দুঃসময়ে বন্ধুর পাশ থেকে ভারত সরে যাবে না। ভারতও জানে, হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার দাবি না-জানিয়ে ঢাকার উপায় নেই। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এমনই। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা চায়, হাসিনা যাতে কোনও রাজনৈতিক কথাবার্তা না বলেন ভারত তা নিশ্চিত করুক। এমন কিছু যেন না করেন যাতে বাংলাদেশে অশান্তি সৃষ্টি হয়। যাতে মনে হয়, ভারত হাসিনাকে উসকানি দিচ্ছে। 

প্রকাশ্যে না এলেও আগে কয়েকবার হাসিনা সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক ভাষণ দিয়েছেন। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে। ভারত সাফাই দিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে অডিও ক্লিপিং যে কোনও দেশ থেকেই ছাড়া যায়। বাংলাদেশ সে নিয়ে বিশেষ বাড়াবাড়ি করেনি। কিন্তু এবার করল দু’টি কারণে। প্রথম কারণ, হাসিনা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য ৫ আগস্ট দিনটিকে বেছে নিয়েছেন বলে। ওই দিনই তাঁকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিল।

ওই দিনটি ‘অভ্যুত্থানের দিন’ হিসাবে চিহ্নিত। ওই দিনটি ঘিরে অনেক আবেগ। দ্বিতীয় কারণ, বাংলাদেশের আপত্তি আমল না দেওয়ায়। ফরেন করেসপন্ডেটস ক্লাবের আয়োজনের কথা জানাজানি হওয়া মাত্র বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ করেছিল। দাবি জানিয়েছিল, ভারত যেন ওই অনুষ্ঠান বন্ধে ব্যবস্থা নেয়। ঢাকা ভেবেছিল, তাদের আপত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে নয়াদিল্লি হয়তো পদক্ষেপ করবে সম্পর্কের খাতিরে। তাদের সেই ধারণা নস্যাৎ হওয়ায় ঢাকা মনে করছে, বাংলাদেশের সরকার ও হাসিনার মধ্যে ভারত সম্ভবত হাসিনাকেই বেছে নিতে চাইছে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে চাইছে। ভারত হয়তো ভাবছে, আজ হোক কাল হোক হাসিনা দেশে ফিরে ফের ক্ষমতা দখল করবেন। আবার ফিরে আসবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুসময়। ভারত সেই সলতে পাকানোয় সাহায্য করছে।

ঘটনা হল, হাসিনার অডিও ভাষণ, অন্তরালে থেকেও বিভিন্ন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিষোদ্গার, তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ ও ‘ঘৃণা’বর্ষণ, বাংলাদেশ সরকারকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে– ৫ আগস্ট রাতে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি তার প্রমাণ। প্রতিবাদী বয়ান কূটনৈতিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত কঠোর। কোনও ‘বন্ধু’ দেশ এই ভাষায় ‘বন্ধুর’ সমালোচনা করে না। অসন্তোষ প্রকাশ করে না। ভারত বারবার বলেছে, হাসিনার বক্তব্য সরকার অনুমোদন করে না। তাঁর আচরণের সঙ্গে ভারতের কোনও লেনাদেনা নেই। তিনি কথা বলেছেন এক বেসরকারি মিডিয়া মঞ্চ থেকে যাতে সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। কিন্তু ঢাকার ক্ষোভ, ক্রোধ ও উষ্মা প্রশমিত হয়নি। ভারত-বিরোধী শক্তি এই ঘটনায় এতটাই উদ্বুদ্ধ যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তারা চাপ দিচ্ছে ‘ব্রিক্‌স’ শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ না নিতে। ভারতে না যেতে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তারেককে ‘বিমসটেক’-এর চেয়ারপার্সন হিসাবে আমন্ত্রণ জানানোকে তারা অসম্মান মনে করছে। এই মহল ক্রমাগত তারেকের কানে বিষ ঢালছে। কান ভারী করছে। বলছে, ব্রিকসে যাওয়া ঠিক হবে না।

সোমবারে, ১০ আগস্টের বৈঠকে তারেকের মানভঞ্জনে দীনেশ ত্রিবেদী সফল হলে দুই দেশের মঙ্গল। তিনি যথার্থই বলেছেন, দুই নেতা মুখোমুখি আলোচনায় বসলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়।
ভারত ও বাংলাদেশ নিছক প্রতিবেশী নয়, একে-অন্যের পরিপূরক। এই সত্য দুই দেশের রাজনৈতিক কান্ডারিদের অনুধাবন করতে হবে। হাসিনার সংবাদ সম্মেলন, বিএনপির প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ সমালোচনা ঢাকাকে যে ক্ষুব্ধ করেছে সেই বোধ সাউথ ব্লকের অবশ্যই আছে। বিদেশমন্ত্রক বারবার তাই বলেছে, ওই মঞ্চ থেকে যা যা বলা হয়েছে কোনও কিছুই ভারত অনুমোদন করে না। আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত ‘ইনক্লুসিভ’ মনে করেনি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিদেশমন্ত্রক সে দেশের সরকারকে ‘বৈধভাবে নির্বাচিত’ বা ‘ডিউলি ইলেকটেড গভর্নমেন্ট’ বলেছে। এই প্রথম বিদেশ মন্ত্রকের এমন প্রকাশ্য ঘোষণা। ঢাকার বোঝা উচিত, এমন মন্তব্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহেরই বর্হিপ্রকাশ। ইতিবাচক ইঙ্গিত। হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভারত পদে পদে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলে বাংলাদেশকে বিব্রত, ব্যতিব্যস্ত ও অস্থিতিশীল করতে চায়। তাতে ভারতেরই অমঙ্গল।

যাঁরা তারেক রহমানের কান ভারী করছেন, তাঁদের বোঝা উচিত, সম্পর্ককে স্রেফ হাসিনা-কেন্দ্রিক করে লাভ নেই। ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক আসরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি এলে সেটা তাঁর কূটনৈতিক বিচক্ষণতারই পরিচয় দেবে। গণতন্ত্র ও কূটনীতিতে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ– এনগেজমেন্ট ইজ দ্য কি।
সূত্র- সংবাদ প্রতিদিন