রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আতিয়ার রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আর্থিক অডিটের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। একই সঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (পিডি) কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমপ্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার রাবিপ্রবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শরিফ উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
ছাত্রদলের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর অর্থ, নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সংগঠনটির দাবি, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আতিয়ার রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়া, উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নথিপত্রের ভিত্তিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। এজন্য সাবেক ভিসি’র দায়িত্বকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সব নিয়োগ প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় এনে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন এবং ওই সময়ে বাস্তবায়িত ও চলমান সব উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণকাজ ও ক্রয়প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ অডিট করার দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির ভাষ্য, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে সামপ্রতিক সময়ে রাবিপ্রবি’র কয়েকজন শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পিডি’র বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরে তারা ধারাবাহিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি উপাচার্যকে আল্টিমেটাম এবং অনশন কর্মসূচিও পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদলও। তবে আন্দোলনের ধরন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশের বিষয়টি নিয়েও ছাত্রনেতা ও শিক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে প্রথমে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে লিখিতভাবে দেয়া উচিত। কর্তৃপক্ষ অভিযোগ আমলে না নিলে পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ করা যেতে পারে।
রাবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে তারাও একমত। সাবেক ভিসি’র সময়ের কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ছাত্রদলও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে কার্যত পুরো প্রতিষ্ঠানকেই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত, কিন্তু এর দায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বর্তানো উচিত নয়। গত ১৫ই জানুয়ারি ২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীতিমালাটি প্রকাশ করে। এতে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান রয়েছে।
নীতিমালার ‘দ’ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যেকোনো উদ্দেশ্যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করলে তা চূড়ান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, নীতিমালা জারি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (পিডি) কর্মকর্তা আব্দুল গফুরের নিয়োগ ও প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গফুর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং একটি সরকারি আদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে সচেতন শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে যথাযথভাবে অভিযোগ উপস্থাপন না করে সরাসরি তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা কতটা যৌক্তিক। রাবিপ্রবি’র বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সাবেক ভিসি অধ্যাপক আতিয়ার রহমানের দায়িত্বকালীন নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান পিডি’র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দুই ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ডে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্যও তদন্তের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব। ফলে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নথিপত্র, অডিট রিপোর্ট, প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বের করে আনার দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে।
