শায়েস্তাগঞ্জে ফিরে দেখা আগস্টের বিজয়

ফন্ট সাইজ:

হবিগঞ্জ জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা শায়েস্তাগঞ্জ। আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাস, রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন ও নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় এ জনপদের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। রেলওয়ে জংশন, দাউদনগর বাজার, ব্যস্ত সড়ক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শায়েস্তাগঞ্জ ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সাক্ষী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৪ ও ৫ই আগস্ট এই দুইদিন শায়েস্তাগঞ্জের রাজপথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা স্থানীয় মানুষের কাছে আজও স্মরণীয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র দাউদনগর বাজার পয়েন্ট পরিণত হয়েছিল আন্দোলন, মিছিল, প্রতিরোধ ও উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রে।

আর ৫ই আগস্ট বিকালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর একই জনপদে দেখা যায় বিজয় উল্লাসের দৃশ্য। ৪ঠা আগস্ট: উত্তাল দাউদনগর বাজার ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট দুপুর থেকেই শায়েস্তাগঞ্জের দাউদনগর বাজার পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা। একপর্যায়ে দাউদনগর বাজার পয়েন্ট পরিণত হয় জনসমাগমের বড় একটি স্থানে। পৌর যুবদল, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি শামসুল আলম রিপন, বিএনপি নেতারা মিছিল নিয়ে দাউদনগর বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। আন্দোলনকারীদের নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

তবে মিছিল ও আন্দোলন চলাকালে এর আড়ালে অন্য একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিষয়টি শুরুতে আঁচ করতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পার্কিং এলাকার দিক থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

হঠাৎ করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় মিছিলের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাথর নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোরও অভিযোগ ওঠে। কয়েক দফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় অনেকেই আহত হন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ওই দিনের হামলায় ছাত্র-জনতা, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অনেকে আহত হন। আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যায় বলেও তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সংঘর্ষের মধ্যে আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন সহযোদ্ধা, স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। কেউ আহতদের রিকশা, অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।

কেউ আবার ঘটনাস্থল থেকে আহতদের সরিয়ে নিরাপদস্থানে নেয়ার চেষ্টা করেন। দিনভর সংঘর্ষ, উত্তেজনা, মিছিল ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে শায়েস্তাগঞ্জের পরিবেশ হয়ে ওঠে থমথমে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। সড়কে স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হয়। রাতে নতুন আতঙ্ক দিনের সংঘর্ষের পর রাতেও উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। আন্দোলনকারী ও ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল এমন অভিযোগও ওঠে আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে।

তবে ৪ঠা আগস্টের রাত যত গভীর হয়, ততই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে নানা খবর। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছিল। শায়েস্তাগঞ্জের মানুষও অপেক্ষা করছিলেন পরদিন কী ঘটতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য। ৫ই আগস্ট: পরিবর্তনের অপেক্ষায় ৫ই আগস্ট সকাল থেকেই শায়েস্তাগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। একদিকে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তৎপরতার অভিযোগ, অন্যদিকে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং ছাত্র-জনতার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান- সবমিলিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ যেন অপেক্ষা করছিল একটি বড় পরিবর্তনের। সকাল গড়িয়ে দুপুর- মানুষের চোখ ছিল মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দিকে।

কী ঘটছে রাজধানীতে সেই খবর জানার জন্য মানুষ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। এরই মধ্যে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত খবর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। খবরটি শায়েস্তাগঞ্জে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় পরিবেশ। দীর্ঘ সময়ের উত্তেজনা, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জায়গা দখল করে নেয় উচ্ছ্বাস। শেখ হাসিনা পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শায়েস্তাগঞ্জে শুরু হয় বিজয় উল্লাস। মিছিল, স্লোগান ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে দাউদনগর বাজার পয়েন্টসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। একদিনের ব্যবধানে পাল্টে গেল দৃশ্যপট ৪ঠা আগস্ট যেখানে ছিল সংঘর্ষ, পাথর নিক্ষেপ, আহতের আর্তনাদ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা- মাত্র একদিন পর ৫ই আগস্ট সেই একই জনপদে দেখা যায় উল্লাসের চিত্র। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শায়েস্তাগঞ্জের রাজপথের এই পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের কাছে হয়ে ওঠে একটি স্মরণীয় ঘটনা।

৪ঠা আগস্টের উত্তাল রাজপথ এবং ৫ই আগস্টের বিজয় মিছিল দুইদিনের ঘটনাই যেন শায়েস্তাগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, ২০২৪ সালের আগস্টের ওই দিনগুলো শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ছিল না; বরং শায়েস্তাগঞ্জের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আন্দোলন, ভয়, প্রতিরোধ ও প্রত্যাশারও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্মৃতিতে ৪ ও ৫ই আগস্ট পেরিয়ে গেছে। রাজপথে এখন আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দাউদনগর বাজারে প্রতিদিনের মতো চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য, সড়কে চলছে যানবাহন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি এখনো অনেকের মনে জীবন্ত।