‘ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই’; ‘দক্ষতা আছে, কিন্তু সুযোগ নেই; ‘স্বপ্ন আছে, কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা নেই’-বাংলাদেশের তরুণদের বর্তমান বাস্তবতার এমনই এক চিত্র উঠে এসেছে দেশব্যাপী এক যুব জরিপে। বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি, মানসিক চাপ, ডিজিটাল আসক্তি, অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তির পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে তরুণদের সীমিত অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেয়া যুব নেতারা।
আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে স্বপ্নপুরী কল্যাণ সংস্থা ও বাংলাদেশ কো-ক্রিয়েশন যৌথভাবে পরিচালিত বাংলাদেশের তরুণদের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান শীর্ষক জরিপে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থী, যুব সংগঠক, স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক ও উন্নয়নকর্মী এবং বিভিন্ন যুব উদ্যোগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা তরুণদের প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য সমাধানের কথাও তুলে ধরেছেন।
জরিপের উত্তর বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমস্যার ধরন ভিন্ন হলেও অধিকাংশ তরুণের অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে রয়েছে অভিন্ন বাস্তবতা-তরুণদের সম্ভাবনার অভাব নেই; বরং সেই সম্ভাবনা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ, দক্ষতা, দিকনির্দেশনা ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্র এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বেকারত্ব সবচেয়ে বড় উদ্বেগ: জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ বেকারত্বকে তরুণদের অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এফএফসিআরজে-এর সদস্য আবু হুরায়রা শেখ, নবজাগরণ ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক মো. মহিবুল্লাহসহ অনেকে বলেছেন, শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। শুধু চাকরির সংখ্যা কম হওয়াই সমস্যা নয়; চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে তরুণদের প্রস্তুতি ও দক্ষতারও বড় ধরনের অমিল রয়েছে। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় কর্মহীন কিংবা আংশিক কর্মসংস্থানে থেকে যাচ্ছে।
সনদ বাড়লেও দক্ষতা কতটা বাড়ছে: জরিপে অংশ নেওয়া অনেকেই মনে করেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষাভিত্তিক ও সনদনির্ভর। আনকোরার ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস অ্যান্ড অপারেশন কৌনিক দেবনাথ বলেন, অনেক তরুণের একাধিক শিক্ষাগত সনদ থাকলেও যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেকে উপস্থাপনের দক্ষতা যথেষ্টভাবে গড়ে উঠছে না।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে ব্যবধান: বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম বলেন, অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করলেও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা অর্জন করতে পারেন না।
আইভিডিএস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান এবং ওএবি ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক ধ্রুব চৌধুরীর মতে, হাতে-কলমে শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
নীরব সংকট হতাশা ও মানসিক চাপ: জরিপে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। ডিসএবল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশের সদস্য সালেহা কে. তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা ও বিষণ্নতাকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গাবুরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সঠিক দিকনির্দেশনার সংকট অনেক তরুণকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ডিজিটাল আসক্তি ও অনলাইন জুয়া: ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত, অনলাইন জুয়া,ক্যাসিনো গেম এর ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেয়া তরুণরা। ইসলামিক সোসাইটি সংঘ বুড়িমারীর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম অভি মোবাইল ফোনের অপব্যবহার ও মাদকাসক্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ইয়ুথ ফর চেঞ্জের কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর আয়শা খাতুন আশা বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে তরুণদের মনোযোগের ঘাটতি, সময় অপচয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. গোলাম মোমিন অনলাইন জুয়া ও বেটিংকে তরুণদের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন অনেক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়ে যাচ্ছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ কতটা: ফ্রাইডেজ ফর রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জাকি মুজাহিদুল ইসলাম যুব ক্ষমতায়নের ঘাটতিকে একটি মৌলিক সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।
বিদেশমুখিতা ও ‘ট্রানজিট মানসিকতা’: জরিপে তুলনামূলক ব্যতিক্রমী একটি বিষয় তুলে ধরেছেন দ্বীপাঞ্চল ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ্।
সমাধানের পথও দেখাচ্ছেন তরুণরা: জরিপে অংশগ্রহণকারী তরুণদের মতামত বিশ্লেষণে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মেন্টরশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সহজ শর্তে অর্থায়ন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।তাদের মতে, তরুণদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, মানসিক সুস্থতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তরুণদের কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের বক্তব্যে একদিকে যেমন বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি, মানসিক চাপ ও সামাজিক ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি উঠে এসেছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও। তাদের প্রত্যাশা—সুযোগ, অংশগ্রহণ ও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য একটি ন্যায্য ও সহায়ক পরিবেশ।
স্বপ্নপুরী কল্যাণ সংস্থা ও বাংলাদেশ কো-ক্রিয়েশনের উদ্যোগের আয়োজকদের মতে, তরুণদের নিয়ে কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের আগে তাদের কথা শোনা জরুরি। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের মতামতও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের যুবসমাজ শুধু ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নয়, বর্তমানেরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন-সৃষ্টিকারী শক্তি। তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ, সহায়ক পরিবেশ এবং অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
