সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তার গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সম্পত্তির দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তার তিন সৎ ভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে দিরাই আদালতে মামলা করেছেন সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীন
আক্তার। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎ ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী, দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের মৃত নাজমুল ইসলামের ছেলে আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের আব্দুন নুর মিয়ার ছেলে ছয়ফুল চৌধুরী, তল বাউসী গ্রামের দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ার কাপন গ্রামের নাজমুল ইসলামের ছেলে তাজুল ইসলাম এবং দিরাইয়ের নুরুল ইসলামের মেয়ে মোহরার মমতাজ বেগম।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার মারধর ও শ্লীলতাহানির শিকার হন। এরপর নাছিরের বাড়িসহ সম্পত্তি থেকে তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের বঞ্চিত করে সম্পত্তি আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৫শে জানুয়ারি দিরাই এসআরও অফিসের দুই কর্মচারীকে অফিসার সাজিয়ে অসুস্থ ও অক্ষম নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে সম্পত্তির দলিলে স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে অভিযুক্তরা তার গলায় রামদা ধরে স্বাক্ষর না করলে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেয়। এ সময় নাছিরের প্রথম স্ত্রী শেলী চৌধুরী ঘটনাস্থলে এসে বাধা দিলে মিজানুর রহমান চৌধুরী তাকেও হত্যার হুমকি দেন। একপর্যায়ে শেলী মেঝেতে ঢলে পড়েন। পরে নাছিরের টঙ্গর এলাকার সমর্থক ওয়াকিব হাসান তাকে দেখতে ওই বাড়িতে গেলে কথিত ঘটনাটি দেখতে পান। এরপর মঈন উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে ওয়াকিব হাসানকে সেখান থেকে বের করে দেন। মামলাটি আমলে নিয়ে দিরাই আদালতের বিচারক মো. জসিম তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)কে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পেশকার মুহিত লাল চন্দ মিঠু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাদী পারভীন আক্তারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী কাওছার আলম। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত দিরাই উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব ও এমপি’র সৎ ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দলিল রেজিস্ট্রি করেন সাব- রেজিস্ট্রার। আমার বোন এবং নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ‘প্রকৃত’ স্ত্রী বিষয়টি জানতেন। মামলা কী হয়েছে জানি না। জানার পর আইনি ভাবেই জবাব দেয়া হবে। এদিকে মামলা দায়েরের পর দিরাই-শাল্লা বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমপ্রতি স্থানীয় একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভীন আক্তার দাবি করেন, দিরাই-শাল্লা বিএনপিতে কোনো বিভক্তি নেই। নাছিরের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। পারভীন আক্তারের অভিযোগ, দলের ভেতরে থাকা একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য, মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের বলয়ের কিছু লোক এ অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত। তিনি দাবি করেন, গত নির্বাচনে ওই বলয়ের লোকজন ধানের শীষে ভোট দেয়নি। পারভীন আক্তার বলেন, বিএনপিতে কোনো দ্বিধা-বিভক্তি তৈরি হয়নি। বিএনপি আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ আছে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যারা মূলত জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত। মাসুক চৌধুরীর বলয়ের কিছু লোক এই অপচেষ্টায় জড়িত। তিনি আরও বলেন, দুই বছর আগে নাছির চৌধুরীকে তথাকথিত ‘আয়নাঘরে’ আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। সেখান থেকে প্রতিকূল অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই নির্যাতনের মানসিক আঘাত তিনি এখনো বহন করছেন। পারভীনের ভাষ্য, একটি মহল তার শেষ বয়সে এসে তাকে নানাভাবে মানসিক কষ্ট দিচ্ছে, এমনকি তার বাড়ি পর্যন্ত লিখে নেয়া হয়েছে। ঈদের দিনও তিনি কান্নাকাটি করেছেন। দিরাই-শাল্লায় সমপ্রতি অনুষ্ঠিত দলবিরোধী একটি সভার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই সভার কোনো গুরুত্ব নেই। নাছির চৌধুরীর নেতৃত্বেই দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে। সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, সরকারের সব বরাদ্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে আসে এবং সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তা বণ্টন করা হয়। তারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো সরকারি বরাদ্দের টাকা স্পর্শ করেন না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঈদের আগে ১০ লাখ টাকা ও শাড়ি বরাদ্দ এসেছিল। সংসদ সদস্যের নির্দেশে দিরাই-শাল্লার বিভিন্ন এলাকায় সুষমভাবে তা বিতরণ করা হয়েছে। পারভীন বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে কারও প্রতি কোনো শত্রুতায় জড়ানোর ইচ্ছা নেই। হয়তো মাসুক চৌধুরীর বলয় আমাকে বা আমাদের শত্রু মনে করতে পারে। তবে গুটিকয়েক মানুষের এই স্বার্থান্বেষী চক্রান্তের কারণে দিরাই-শাল্লার ঐতিহ্যবাহী বিএনপি বা নাছির চৌধুরীর জনপ্রিয়তা কখনো ধ্বংস হবে না।
