৩৫ বছর পর ব্যালটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

৩৫ বছর পর ব্যালটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ব্যালটের মাধ্যমে ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট। আগামী ২০শে আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। ওইদিন দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচনে ৩৪৯ জন জাতীয় সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে ভোট দেবেন। ভোটারকে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষে একই কক্ষে ব্যালট গণনা করে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে।

৭০ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোট। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি দু’টি মনোনয়ন ফরম তুললেও এখনো দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেনি দলটি। আগামীকাল ১৩ই আগস্ট মনোনয়ন জমার দিন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে। বিএনপি’র দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম অনেকটাই চূড়ান্ত। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান। শেষ মুহূর্তে চমকও আসতে পারে। এদিকে এবারের প্রেসিডেন্ট পদে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি দল ও বিরোধী দল প্রার্থী দেয়ায় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। যদিও সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীরই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ৩৪৯টি ভোটের মধ্যে সরকারি দলের ভোট রয়েছে ২৫৯টি আর বিরোধী দলের ৯০টি।

প্রায় ৩৫ বছর পর ভোটের লড়াই: দীর্ঘ সময় পর এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সরাসরি ভোটাভুটির এমন পরিস্থিতি আর তৈরি হয়নি। এতদিন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী এককভাবে থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় ২০শে আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যেভাবে হবে ভোটগ্রহণ: এদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল নির্বাচন কমিশনে এক প্রেস ব্রিফিং করেছেন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ২০শে আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে নিজ নিজ আসনে বসে ভোট দেবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়ক কর্মকর্তারা সংসদ সদস্যদের কাছে ব্যালট পৌঁছে দেবেন। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পর সদস্যরা সামনে রাখা তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের যেকোনো একটিতে ব্যালট জমা দিতে পারবেন। আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচনে মোট ব্যালট থাকবে ৩৪৯টি। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিবেশন কক্ষেই ভোট গণনা করা হবে। গণনা শেষে সেখানে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করবেন সিইসি। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

এর আগে গত ৬ই আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল ১৩ই আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। ১৬ই আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ই আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।

ব্যালট পেপারে যা থাকবে: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যালট পেপারের কাঠামোও তুলে ধরেছেন ইসি সচিব। তিনি জানান, ব্যালট পেপারের দু’টি অংশ থাকবে। একটি অংশকে বলা হবে ‘মুড়ি’। এতে ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষরের জায়গা থাকবে। অপর অংশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে। ভোটারকে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। নির্বাচনী কাজে নির্বাচন কমিশনের ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা থাকবে। নির্বাচন কমিশনাররাও উপস্থিত থেকে পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব। বাকি বিষয়গুলো জাতীয় সংসদ সচিবালয় সমন্বয় করবে। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও ফল গণনার কার্যক্রম গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সংসদ থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা থাকবে। সাংবাদিকদের জন্যও নির্ধারিত আসনের ব্যবস্থা করা হবে। ইসি সচিব জানান, ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার কার্যক্রম সংবাদকর্মীরা প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। দীর্ঘ বিরতির পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হতে যাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

আখতার আহমেদ বলেন, বিকাল ৫টায় ভোট গ্রহণ সমাপ্তির পরপরই অধিবেশন কক্ষের ভেতরে রাখা ব্যালট বক্সগুলোর সামনেই সরাসরি ভোট গণনা শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত চার বা পাঁচজনের গঠিত একটি ব্যালট গণক দল ব্যালট পেপার শর্ট আউট করে গণনা কার্যক্রম শেষ করবে। মোট ৩৪৯টি ব্যালটের মধ্যে কতোটি বৈধ বা বাতিল হয়েছে এবং কোন প্রার্থী কতো ভোট পেয়েছেন, তা নির্বাচন কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) অধিবেশন কক্ষেই সরাসরি সবার সামনে ঘোষণা করবেন। পরবর্তীতে কমিশন সচিবালয়ে এসে অফিসিয়ালি ফলাফলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্য পদ থাকবে না: এদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধিত হয়নি, সুতরাং এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কার্যকর হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটদানের প্রক্রিয়া তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, সংসদ সদস্যরা প্রার্থীর সামনে তার নাম লিখবেন প্রকাশ্যে, বিভক্তি সংখ্যা লিখবেন। কাজেই আমি কাকে ভোট দিচ্ছি তা জানা যাবে। এ নির্বাচন সামনে রেখে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকা হচ্ছে না বলে জানান চিফ হুইপ। ভোটের দিন সংসদ কক্ষে বৈঠক ডাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এই বৈঠকে যার যার আসনে সংসদ সদস্যরা বসবেন। নির্বাচনী কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। তফসিল অনুযায়ী বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে ভোট শেষ হয়ে গেলে গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে। কোনো ভোটার দেরি করলে ৫টা পর্যন্ত সময় থাকবে।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ভোট দেয়ার সময় গণমাধ্যমে দেখানো হবে। পরে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময় ভোট দেবেন। সবাই ভোট দেয়ার পর গণনা করা হবে।”

সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিএনপি’র দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন তখন আপনারা আমরা সবাই একসঙ্গে জানবো। যেদিন আমাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হবে, দাখিলের সময় আমরা সবাই জানবো। তিনি বলেন, প্রার্থী চূড়ান্ত করতে তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে দল, তিনি প্রার্থী ঘোষণা করবেন। বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় এ নির্বাচনও হচ্ছে।

নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের জন্য একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন এবং আমরা দেশবাসীকে রাজনৈতিক অবস্থানটাও জানান দিতে চাই। আমাদের যিনি প্রার্থী, তাকে আমরা মনে করছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভিভাবকত্ব হিসেবে তিনি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হবেন।

‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেতো। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতো। তারপরেও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, এটাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিতে চাই না। আমরা সে কারণে বিরোধী দলের জায়গা থেকে প্রার্থী দিয়েছি।

এর আগে সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। সভায় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপদের মধ্যে মো. জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ. বি. এম আশরাফ উদ্দিন নিজান অংশগ্রহণ করেন।

উল্লেখ্য, গত ২৪শে জুলাই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচিত দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।