জামালপুরের মেলান্দহে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় একটি মামলা করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলার এজাহারে যে ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে, বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এমনকি মামলার বাদীকে যে ধরনের আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার স্বপক্ষেও কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে দাবি পরিবারের। এরপরও মামলাটি করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। পুলিশের ভাষ্য, বাদী বোরকা পরা থাকায় তার শরীরের আঘাত দেখার সুযোগ হয়নি-এমন অদ্ভুত যুক্তিতে কোনো ধরনের প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই অজানা উদ্দেশ্যেই মেলান্দহ থানার ওসি এ টি এম মাহমুদুল হক মামলাটি রেকর্ড করেন।
এতে মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন ওই পরিবারটি। গত বৃহস্পতিবার (৬ই আগস্ট) বাদী হয়ে মামলাটি করেন মেলান্দহ উপজেলার মুন্সী নাংলা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মোসা. কল্পনা (৩০)। মামলায় একই গ্রামের মো. আসাদ মিয়া (৪২) ও তার স্ত্রী মোসা. সাহারা বেগম (৩৭)কে আসামি করা হয়েছে। মামলায় পুলিশ দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭ ও ৫০৬ ধারার কথা উল্লেখ করেছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মামলার আসামিদের কাছ থেকে ২০ শতাংশ জমি বন্ধক নেয়ার জের ধরে ৩রা আগস্ট সকালে আসাদ মিয়া কাঁচি দিয়ে কল্পনার দুই হাতের কব্জি ও গলায় মারাত্মকভাবে আঘাত করেন। এ ছাড়া সাহারা বেগম রড দিয়ে পিটিয়ে কল্পনার পিঠে, কোমরে ও হাত-পায়ে নীলাফোলা জখম করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় সাক্ষীকে দিয়ে মামলার কাগজ পাঠান ওই নারী। সরজমিন অনুসন্ধান ও হাসপাতালের নথিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের নথিতে কল্পনার শরীরে কেবল কিছু নীলাফোলা জখমের উল্লেখ থাকলেও গুরুতর কোনো আঘাতের তথ্য নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান। তবে তিনি স্বীকার করেন, মূলত গত ২১শে জুলাই মামলার আসামি ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে একটি হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। অথচ পুলিশ কোনো ধরনের প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় একটি মামলা নেন। মামলার প্রধান আসামি আসাদ মিয়া বলেন, পূর্বের শত্রুতার জের ধরে ২১শে জুলাই দুপুরে ওই মামলার বাদী ও তার শ্বশুর আব্দুল আওয়ালসহ অনেকেই আমার বাড়িতে ঢুকে আমাদের মারধর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যান। এ ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে।
ঘটনার সত্যতা থাকায় আমি ২৩শে জুলাই থানায় একটি মামলা দায়ের করি। এই মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর পূর্বের মামলার জের ধরে আমাদের হয়রানি ও চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ওই মিথ্যা ভুয়া মামলাটি করায়। মামলায় বর্ণিত ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত। কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই পুলিশ মামলাটি নিয়েছে। আমার অনুরোধ ৩রা আগস্ট দেখানো ঘটনাটি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই মিথ্যা মামলা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়া হোক। প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া কীভাবে এমন মামলা রেকর্ড হলো, জানতে চাইলে মেলান্দহ থানার ওসি বলেন, ভুক্তভোগী নারী এসে অনেক চাপ প্রয়োগ করায় আপাতত এফআইআর করা হয়েছে। নারীটি বোরকা পরে আসায় তার শরীরে ক্ষতের চিহ্ন দেখার সুযোগ হয়নি। তবে কারও সুপারিশে মামলা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা হবে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী এডভোকেট ইউসূফ আলী বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া এফআইআর করা পুলিশের চরম গাফিলতি। জামালপুরের পুলিশ সুপার মোসাঃ ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, আমি এই বিষয়টি নিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। মূলত হাসপাতাল থেকে ভর্তির কাগজ নিয়ে সে ?ওসিকে চাপ প্রয়োগ করে। এরপরে মামলা নেয়া হয়েছে। আমরা হাসপাতালের কাছে সর্টিফিকেট চেয়েছি। হাসপাতাল কি সার্টিফিকেট দিবে, দেখা যাক। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। ওই নারী মিথ্যা বলে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
