স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে যখন নতুন প্রজন্ম বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বইয়ের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন। ‘বই পড়ি, মন গড়ি’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত ২১শে জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব ২০২৬’ এখন বইপাঠে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে। গত রোববার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিফিনের বিরতিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী বসে শ্রেণিকক্ষে, তাদের কারও হাতে সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, কারও হাতে জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম। কেউ বা আবার পড়ছে জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ। স্কুলের টিফিন টাইমে যেখানে হাল্কা নাস্তা শেষে খেলাধুলা ও আড্ডায় মজার কথা সেখানে শিক্ষার্থীরা অবসর সময়ে বই পড়ছে। শুধু ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়।
পুরো উপজেলার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অনার্স পর্যন্ত ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বই পড়া উৎসবে অংশ নিতে নির্ধারিত বই পড়ছে। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও কাব্যের জগতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে সরাসরি শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে। আয়োজন করা হচ্ছে উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ। উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্ব’-এ ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে এই কার্যক্রম। এরই অংশ হিসেবে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে শ্রীমঙ্গলের ২০টিরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয়েছে উদ্বুদ্ধকরণ সমাবেশ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলাপচারিতায় তিনি বইপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। আয়োজকরা জানান, বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব-২০২৬-এ ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের ১৪টি বই নির্বাচন করা হয়েছে। তিন ধাপে আয়োজিত এ উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্ব’-এ উপজেলার মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে।
৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি (পাস) ও অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের ১৪টি বই নির্বাচন করা হয়েছে। উন্মুক্ত বিভাগের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের রাজবন্দীর জবানবন্দী। এসব বই পড়ে তিন ধাপের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের পাঠকদের জন্যও রাখা হয়েছে উন্মুক্ত বিভাগ। উৎসবের প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্ব’। এ পর্বে উপজেলার ৩৮টি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। প্রতিটি শ্রেণির জন্য দু’টি করে বই নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৭ই আগস্ট নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পর্বের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল পর্বে’ অংশ নেবে। ৩০ ও ৩১শে আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে সেই পর্ব। পরে প্রতিটি শ্রেণির সেরা তিনজন উপজেলা পর্যায়ের ‘ফল পর্বে’ অংশ নেবে, যা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ই সেপ্টেম্বর। চূড়ান্ত পর্বে প্রতিটি শ্রেণির সেরা পাঠকদের জন্য রয়েছে ল্যাপটপ, বই, ক্রেস্টসহ বিভিন্ন পুরস্কার। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেদোয়ান চৌধুরী জানান, এবারের বইপড়া উৎসবে আমাদের জন্য মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ’ দিন’ বইটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বইটি পড়ে প্রায় ৫০ বছর আগের ইংল্যান্ডের সমাজ, মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী বলেন, আমি ১৯৯৬ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। তখন শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই নিতো। এখন লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু বই নেয়ার প্রবণতা কমেছে। এর অন্যতম কারণ মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনছে। সিরাজনগর গাউছিয়া সুন্নী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শিব্বির আহমেদ বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ইতিহাসভিত্তিক বই পড়লে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ সমৃদ্ধ হবে।
বইপড়া উৎসবের এই আয়োজন সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়। ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ, উদ্দীপনা সৃষ্টি, উৎসাহ প্রদান এবং তাদের অনুপ্রাণিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণদের বড় একটি অংশ স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমরা চাই তারা আবার বইয়ের জগতে ফিরে আসুক। একটি-দু’টি বই হয়তো কাউকে বদলে দেবে না, কিন্তু নিয়মিত পড়ার অভ্যাস একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে। উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে সমন্বয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ‘উত্তরণ’।
