‘হাতি পথ হারালে বিপদে মানুষও’

‘হাতি পথ হারালে বিপদে মানুষও’

ফন্ট সাইজ:

গভীর রাতে পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে আসে হাতির ডাক। সীমান্তঘেঁষা গ্রামের অনেক কৃষকের ঘুম ভেঙে যায় আতঙ্কে। ফসলের মাঠে হাতির পাল নেমেছে কি না, ঘরবাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে কিনা সেই উৎকণ্ঠায় রাত কাটে। অন্যদিকে খাবার ও পানির সন্ধানে বন থেকে লোকালয়ে নেমে আসা হাতিও পড়ছে নানা ঝুঁকিতে। ফলে নালিতাবাড়ীর গারো পাহাড়ে মানুষ ও হাতি-দু’পক্ষের নিরাপদ সহাবস্থান এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আজ বিশ্ব হাতি দিবস। হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, অস্তিত্বের জন্য হুমকি মোকাবিলা এবং মানুষ-হাতি সংঘাত কমানোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। শেরপুরের গারো পাহাড়ে দিবসটির গুরুত্ব বিশেষ।

কারণ দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে বন্য হাতির বিচরণ এবং মানুষ-হাতি সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাতির সংঘাতে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালের ২৭শে মে পানিহাটা-ফেকামারী এলাকায় রাতে হাতি তাড়াতে গিয়ে অপু মারাক (৪৮) নিহত হন। ২০২২ সালের ২রা আগস্ট মায়াঘাসী পাহাড়ে ঘাস কাটতে গিয়ে হাতির আক্রমণে মারা যান কৃষক ছমেদ আলী (৬৫)। ২০২৩ সালের ৬ই জানুয়ারি দাওধারা-কাটাবাড়ি এলাকায় হাতির সংঘাতে মারা যান শরীফুল আলম। ২০২৪ সালের ১৮ই এপ্রিল বাতকুচি গ্রামে ধানক্ষেত পাহারা দিতে গিয়ে নিহত হন কৃষক উমর আলী। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৯শে মে বাতকুচি নামাপাড়ায় নিজ বাড়িতে হাতির আক্রমণে মারা যান বিধবা সুরতন নেছা। মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

২০২১ সালের ১৯শে নভেম্বর ফেকামারি এলাকায় চাঁন মিয়ার ধানক্ষেতে ২ থেকে ৩ বছর বয়সী একটি হাতিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই সময় এলাকায় প্রায় ৪০টি হাতির একটি পাল অবস্থান করছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। ২০২৪ সালের ৩১শে অক্টোবর রাতে নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী বাতকুচি রাবার বাগান এলাকায় ধানক্ষেতে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে একটি মাদি হাতির মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফসল রক্ষার জন্য ধানক্ষেতে বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চে পূর্ব সমশ্চুড়া-লাল টেংগড় এলাকায় বোরো ধানক্ষেতে বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আরেকটি বন্য হাতির মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, মানুষ-হাতি সংঘাতের ক্ষতি শুধু মানুষের ওপরই পড়ছে না; হাতিও হারাচ্ছে প্রাণ।

হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বনভূমির পরিবর্তন এবং খাদ্য ও পানির সংকটসহ নানা কারণে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়তে পারে। অন্যদিকে কৃষকরাও ফসল ও বসতবাড়ি রক্ষায় নানা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। ফলে সংঘাতের পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উভয়পক্ষই। এ অবস্থায় প্রয়োজন হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ, পাহাড়ে খাদ্য ও পানির উৎস নিশ্চিত করা, কৃষকের জন্য নিরাপদ ফসল সুরক্ষা ব্যবস্থা, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা এবং হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়লে প্রশিক্ষিত দলের দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ। এই লক্ষ্যেই গত ৪ঠা জুলাই নালিতাবাড়ীতে বন্যহাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন ও নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিতকরণে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী। সভায় বন বিভাগ, প্রশাসন, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ফাহিম চৌধুরী জানান, বন্যহাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আগাম সতর্ক করতে গহীন বনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর আর্লি ডিটেকশন ডিভাইস স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এদিকে বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে শেরপুরের বালিজুরি, রাঙটিয়া ও মধুটিলা রেঞ্জে পৃথক র‌্যালি ও আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশ্ব হাতি দিবসে নালিতাবাড়ীর বার্তা তাই একটাই হাতিকে বাঁচাতে হবে, মানুষকেও বাঁচাতে হবে। সংঘাত নয়, প্রয়োজন নিরাপদ সহাবস্থান।