ট্রাম্পকে ‘চ্যালেঞ্জ’ নেতানিয়াহুর, গাজায় আবারও রক্তের স্রোত?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে ‘চ্যালেঞ্জ’ নেতানিয়াহুর, গাজায় আবারও রক্তের স্রোত?

ফন্ট সাইজ:

গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই সিদ্ধান্তে গাজার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় বসবাসকারী ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তৈরি ১৫ দফা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে। এর বিনিময়ে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় একটি কারিগরি বা টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে গাজার প্রশাসনের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত বছর গাজার শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করার পরও ইসরাইল প্রায় প্রতিদিনই প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকার দাবি করা হলেও ইসরাইল গাজার ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকার ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

গতকাল রোববার নেতানিয়াহু কার্যত কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে অচল করে দিয়ে বলেন, হামাস “সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র” না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনারা গাজা থেকে প্রত্যাহার হবে না।

ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তার এই অবস্থান সামনে এলো।

গাজায় নতুন করে হামলার আতঙ্ক

নেতানিয়াহুর ঘোষণায় গাজায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে যে সামান্য আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তাও অনেকটাই ভেস্তে গেছে। একই সঙ্গে আবারও তীব্র হামলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াদ আল-কারা বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে। কারণ বিষয়টি নেতানিয়াহুর আবার হত্যাকাণ্ড, বোমাবর্ষণ ও ‘ইয়েলো এরিয়া’র কাছে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।

‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একতরফাভাবে নির্ধারিত ওই সীমারেখা কার্যত ইসরাইলি বাফার জোন হিসেবে কাজ করছে এবং এর ফলে ফিলিস্তিনিদের আরও ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের ভাষায়, নেতানিয়াহুর অবস্থান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পিত কৌশল।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, এসব অবস্থান “আলোচনার পথ ও এর ফলাফলের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য অভ্যুত্থান”, যা শান্তির পথকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং গাজার মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করছে।

অফিসটি আরও অভিযোগ করেছে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য প্রমাণ করে যে ইসরাইল আলোচনা প্রক্রিয়াকে “মিথ্যা রাজনৈতিক আবরণ” হিসেবে ব্যবহার করছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় কিনছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আলোচনায় থাকার প্রতিশ্রুতি হামাসের

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর হামাস জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অধীনে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে। তবে একই সঙ্গে সব পক্ষকে চুক্তি মেনে চলার জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এক বিবৃতিতে হামাস মধ্যস্থতাকারী, চুক্তির গ্যারান্টিদাতা এবং বোর্ড অব পিসকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়ন ব্যাহত করতে পারে- এমন যেকোনো লঙ্ঘন ঠেকানোরও দাবি জানানো হয়েছে।

ইয়াদ আল-কারা সতর্ক করে বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হন, তাহলে ফিলিস্তিনিদের সামনে “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি”- অর্থাৎ নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানের পর কার্যত আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার- সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি’ মিসরের জন্য রেড লাইন

গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতানিয়াহুর অবস্থানের প্রভাব নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি সতর্ক করে বলেছেন, গাজার জনগণকে জোর করে বাস্তুচ্যুত করার আশঙ্কা এখনো রয়েছে।

মিসরীয় গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, গাজার ভেতরে জীবনযাপন অসম্ভব করে তোলা হলে তাকে “স্বেচ্ছায় বাস্তুচ্যুতি” বলা যায় না।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে গাজার জনগণকে চলে যেতে বাধ্য করা মিসর, আরব ও ইসলামি দেশগুলোর জন্য “রেড লাইন” বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আবদেলাত্তি স্পষ্ট করে বলেন, মিসর গাজার জনগণকে বাস্তুচ্যুত হতে “মেনে নেবে না এবং হতে দেবে না”।

একই সঙ্গে তিনি চুক্তির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যর্থতারও সমালোচনা করেন। বিশেষ করে প্রতিদিন গাজায় অন্তত ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের ন্যূনতম লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

‘বিশৃঙ্খলা তৈরির অজুহাত’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রকৃত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত নয়; বরং চুক্তি বাস্তবায়ন ঠেকানোর একটি পরিকল্পিত পদ্ধতি।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহজুব জুয়েরি বলেন, নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য গাজায় স্বাভাবিক ফিলিস্তিনি সমাজব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকানো।

তার ভাষায়, তিনি চান না ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবরের মতো গাজা আবার হয়ে উঠুক। অর্থাৎ হামাসের শাসন থাকবে না, ফিলিস্তিনিদের শাসনও থাকবে না, অস্ত্র থাকবে না, স্বাভাবিক জীবনও থাকবে না।

তার মতে, এর অর্থ হচ্ছে গাজাকে “মানুষের বসবাসের অনুপযোগী একটি এলাকায়” পরিণত করা। জুয়েরি আরও বলেন, সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারণ করাটা পরিকল্পিতভাবেই একটি অসম্ভব শর্ত। কারণ গাজার মতো পরিবেশে কোথায় কী অস্ত্র রয়েছে তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই এবং কোনো নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য পক্ষও নেই, যারা অস্ত্রের উপস্থিতি যাচাই করতে পারে।

তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়েও সতর্ক করে বলেন, নেতানিয়াহু ও ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে “প্রত্যাশিত কূটনৈতিক ঝড়” এবং এক ধরনের কূটনৈতিক সংঘাত দেখা দিতে পারে।

বাস্তুচ্যুতির পরিকল্পনা ধরে রাখতে চাইছে ইসরাইল

ইসরাইলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিহাদ আবু ঘোশ মনে করেন, গাজার বিষয়ে তেলআবিবের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন দেশটির প্রকৃত কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রকাশ করছে।

তার মতে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত জানতেন। কিন্তু তারা ধরে নিয়েছিলেন, হামাস পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি বলেন, “মূল বিষয় হলো, ইসরাইল বাস্তুচ্যুতির বিকল্পটি ছাড়তে চায় না। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আংশিক আপত্তি কিংবা অন্যান্য আপত্তির আড়ালেও মূলত গাজা থেকে জনগণকে বাস্তুচ্যুত করার ইসরাইলি অবস্থানই প্রতিফলিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু তার বর্তমান প্রত্যাখ্যানকে ভবিষ্যতের যেকোনো ইসরাইলি সরকারের জন্য একটি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করতে চান।

রাজনৈতিক টিকে থাকাও নেতানিয়াহুর হিসাব?

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তের সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।

লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু ২০১৯ সাল থেকে একাধিক দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার কারাদণ্ডও হতে পারে।

ইসরাইলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আদেল শেদেদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এত বড় পরিসরে “না” বলার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন নেতানিয়াহু। এর মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা, রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছেন।

তার মতে, নেতানিয়াহু ইসরাইলি জনগণকে বোঝাতে চান যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বিরুদ্ধেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়ার মতো একমাত্র নেতা তিনিই।

আরেক বিশেষজ্ঞ সুলেইমান বিশারাতের মতে, বৃহত্তর আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির জন্যও গাজা ইস্যুকে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু।

তার ভাষায়, এটা খুবই স্পষ্ট যে নেতানিয়াহু সব ইস্যুর হিসাব বদলে দিতে চেয়েছেন- গাজা দিয়ে শুরু করে। কারণ তার কাছে গাজা ইস্যুটিই বাকি সব ইস্যুর ভিত্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, ডানপন্থী ইসরাইলি জনগণের কাছে নিজেকে ‘নায়ক’ হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করাও নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন