নিখোঁজের পর শিশু হত্যা বাড়ছে আতঙ্ক

নিখোঁজের পর শিশু হত্যা বাড়ছে আতঙ্ক

ফন্ট সাইজ:

শিশুটির বয়স সাত বছর। প্রথম শ্রেণিতে পড়তো। প্রতিদিনের মতো বিকালে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে আসার কথা থাকলেও সেদিন আর ফেরেনি। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় শুরু হয় শিশুটির পরিবারের খোঁজাখুঁজি। রাতভর বিভিন্ন স্থানে খুঁজে কোথাও মেলেনি সন্ধান। ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ১৫ই জুন। পরদিন লালমনিরহাটের আদিতমারীতে একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে তার বস্তাবন্দি ও মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

শুধু সাত বছরের এই শিশুটি নয়, প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশু নিখোঁজ হচ্ছে। তাদের কেউ ঘরে ফিরছে আবার কেউ ফিরছে না। আবার কারও কারও মরদেহ নদী, নালা ও পুকুরে ভেসে উঠছে। কেউ হচ্ছে নিখোঁজের পর ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের পর আবার হত্যার ঘটনাও ঘটছে। শিশু ছাড়া বড়দের ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা। নিখোঁজের পর লাশ মিলছে অনেকের। এদিকে, ‘কিছুক্ষণ পরই ফিরবো’ বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় এমন একটি সাধারণ বাক্যই অনেক পরিবারের কাছে শেষ স্মৃতি হয়ে থাকছে। ঘণ্টা পেরিয়ে দিন, দিনের পর দিন কেটে যায়। কোনো খোঁজ নেই। শুরু হয় আত্মীয়স্বজনের কাছে খোঁজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে এক ভয়াবহ সংবাদে- কোথাও পড়ে আছে নিথর দেহ। কোনো নির্জন স্থান, নদী, খাল বা ঝোপ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ। সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু ঘটনায় জনমনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

নিখোঁজের ৮ দিন পর মিললো প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মরদেহ: ময়মনসিংহে নিখোঁজের আটদিন পর ডোবা থেকে সাউমী সাবা (৬) নামে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবার দাবি করছে, শিশুটিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, বৃষ্টিতে ভিজতে বের হয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে। ২৯শে জুন সন্ধ্যা ৬টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বয়রা ফকির বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
খেলতে গিয়ে নিখোঁজ শিশু হুমায়রা: শুক্রবার সন্ধ্যার আগে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয় চার বছরের শিশু হুমায়রা জান্নাত। বাড়িতে না ফেরায় মেয়ের খোঁজ করেন মা তোষী খাতুন। সারারাত এখানে-সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও হুমায়রার সন্ধান না পেয়ে অজানা আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়ে পরিবার। জানানো হয় পুলিশকে। নিখোঁজের ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বাড়ির নিকটবর্তী একটি খেজুরগাছের নিচ থেকে শিশু হুমায়রার লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার হাটকানপাড়া বাজার এলাকায়।

ধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলা হয়েছে ডোবায়: কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় নিখোঁজের দুইদিন পর সাত বছরের শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার দিন সকাল ১১টায় উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ডোবায় ফেলা হয়েছে। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণিতে পড়তো।

তিনদিন পর মাছের ঘেরে মিললো রহমানের লাশ: সাতক্ষীরায় নিখোঁজের তিনদিন পর মিললো ১৪ বছর বয়সী শিশু আব্দুর রহমানের মরদেহ। ১০ই জুলাই সকালে সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কুলতলা গ্রামে বাড়ির পাশের একটি মাছের ঘের থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, ঘেরের পানিতে মরদেহটি ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত আব্দুর রহমান কুলতলা গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে।

শিশু মুনতাহাকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুম: সিলেটের কানাইঘাট থেকে নিখোঁজ হওয়া পাঁচ বছরের শিশু মুনতাহা আক্তারকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য ডোবায় পুঁতে রাখা হয়েছিল। পুলিশ জানায়, নিখোঁজের ছয়দিন পর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনকে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে। পরে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে ডোবা থেকে লাশ তুলে পুকুরে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। নিহত মুনতাহা কানাইঘাট সদরের বীরদল ভাড়ারিফৌদ গ্রামের শামীম আহমদের মেয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নিখোঁজের ঘটনাগুলো অধিকাংশই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুগুলো বেশি সহিংসতার শিকার হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনায় বিশেষভাবে নজর দেয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। এ ছাড়া, শিশুদের প্রতি বাবা-মায়ের সবচেয়ে বেশি নজর রাখা উচিত। তবেই নিখোঁজ বা সহিংসতার ঘটনা কম ঘটবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, মুন এলার্ট বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জরুরি শিশু অনুসন্ধান ও সতর্কতা ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের উদ্যোগে এটি চালু হয়। মুন এলার্টে আমরা বিভিন্ন তথ্যগুলো দিয়ে দিই। তাতে এটি বেশি ছড়িয়ে যায় এবং তথ্য পেতে সহজ হয়। এটি শিশু অনুসন্ধান ও সতর্কতা ব্যবস্থা। জনগণ জানতে পারে এমন ঘটনা ঘটেছে। এতে শিশুটিকে খুঁজে পেতে সহজ হয়। নিখোঁজের তথ্য পেলেই আমরা কাছাকাছি থানায় যোগাযোগ করি। পুলিশিং এবং তথ্যগুলো পাঠানোর কাজটি আমরা করছি।








===========




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন