বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে কন্ট্রাক্টর ও আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল, শ্রম আইন অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত এবং অভিজ্ঞ এইড নার্স ও টেকনিশিয়ানদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
সোমবার সকাল ১০টায় নগরের প্রবর্তক মোড়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি আব্দুর রহিম। সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত। মানববন্ধনে তপন দত্ত বলেন, গত কয়েক দশকে দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা পেলেও এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ এখনো ন্যায্য মজুরি ও শ্রম আইনে নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড থাকলেও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য এখনো কার্যকর কোনো মজুরি বোর্ড নেই। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অল্প বেতনে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক, ছুটি, ওভারটাইম ভাতা, উৎসব বোনাস, ভবিষ্যৎ তহবিল, বীমাসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানেই এসব সুবিধা যথাযথভাবে দেয়া হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হলেও অতিরিক্ত শ্রমের আইনানুগ পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। শ্রম আইন লঙ্ঘনের এসব ঘটনা বন্ধে শ্রম অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নজরদারি ও কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ইফতেখার কামাল আরও বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতকে এগিয়ে নিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা অভিজ্ঞ এইড নার্স ও টেকনিশিয়ানদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অন্যতম উপায় হয়ে উঠেছে কন্ট্রাক্টর ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ। এ ব্যবস্থায় কর্মীরা কম মজুরি পাওয়ার পাশাপাশি শ্রম আইনে নির্ধারিত বিভিন্ন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এ ধরনের নিয়োগব্যবস্থা বন্ধ করা জরুরি। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটের সময়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অথচ তাদের মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসূচিতে টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু, সংগঠনের সাবেক সভাপতি বিকাশ বসু, কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটর্স কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. পারভেজ, হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হানিফ, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি আনিসুর রহমান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা বিপ্লব চক্রবর্তী, সুপর্ণা বড়ুয়া, মোকাদ্দেসা খানম, আকতার হোসেন, মিঠুন বড়ুয়াসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
মানববন্ধন থেকে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, অভিজ্ঞ এইড নার্স ও টেকনিশিয়ানদের চাকরির ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত, কন্ট্রাক্টর ও আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল এবং শ্রম আইন অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। পরে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেন। মিছিলটি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ মাহবুবের রহমানের মাধ্যমে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হয়।
