বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল দুই বছর। কোনদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলত, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি। এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করব। আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার... হামার দুই বাবারে বুকে এনে দ্যাও। এভাবেই বিলাপ করতে করতে বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত দুই ভাই সুমন ও মোহন প্রামাণিকের মা ময়না খাতুন। তার বুকজুড়ে এখন শুধু দুই সন্তানের ছবি। একে একে দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় এই মা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ। সোমবার সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামে সুমন ও মোহনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্না আর আহাজারি।
এর আগে গত রোববার দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইসহ ওই গ্রামের চারজন নিহত হন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না খাতুন বলেন, কালকে (রোববার) মেজো ব্যাটার সঙ্গে সকালে কথা কইছি। কইল, ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও। তুমি সুস্থ থাকো। ভাই মাল দিতে গেছে, মাল দিয়ে আসবে। এরপর যখন আগুন লাগে, তখন ফায়ার সার্ভিস আসছিল না। ওই সময় ছাওয়াল ভয়েস মেসেজ দিছে। কইছে, মা গো, দুইডা কথা কইমু মা, আমি আর কথা কইমু না নে মা। আগুন লাগছে, পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি। এরপর আর কোনো কথা হয়নি সন্তানের সঙ্গে। সেই শেষ কণ্ঠস্বরই এখন মায়ের কানে বারবার বাজছে। ময়না খাতুন বলেন, হামার(আমার) দুই বাবারে হামার বুকে এনে দেও বাবা। আমার বাবাদেরকে দেখে আমি কলিজা শান্তি করমু বাবা। বড় কষ্টের ছাওয়াল, আমার দুই ধনকে আমার বুকে এনে দে বাবা রে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা স্বপ্ন ছিল এই মায়ের। মোহন প্রায়ই মাকে বলতেন, দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। ময়না খাতুন বলেন, মোহন কইতেছিল, এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না! কত স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সুমন ও মোহন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে ছিলেন। পরিবারের ঋণ পরিশোধ এবং বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করার স্বপ্ন ছিল তাদের। মাকে দেয়া কথা অনুযায়ী দেনা শোধ করে দেশে ফিরে বাড়ির অসমাপ্ত কাজ শেষ করার কথা ছিল সুমনের। কিন্তু সেই বাড়িতে তার আর ফেরা হলো না।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
