গাজা নিয়ে ট্রাম্প ও স্মোটরিচের মাঝে দ্বিধায় নেতানিয়াহু, নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের চেষ্টা

হারেৎস-এর বিশ্লেষণ

গাজা নিয়ে ট্রাম্প ও স্মোটরিচের মাঝে দ্বিধায় নেতানিয়াহু, নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের চেষ্টা

ফন্ট সাইজ:

নির্বাচনের মাত্র আড়াই মাস আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে রোববার সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভা বৈঠকের শুরুতেই ‘বোর্ড অব পিস’-এর রোডম্যাপের তীব্র সমালোচনা করবেন, তা নিয়ে সম্ভবত কেউই খুব একটা অবাক হননি। কারণ তাকে পরস্পরবিরোধী দুই চরম অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠনের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী দুই মিত্র এবং লিকুদের দুর্বল হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রচারণা তাকে এক মিলিমিটারও ছাড় দিতে দিচ্ছে না। ১০ দিন ধরে নেতানিয়াহুকে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, কীভাবে তিনি ‘বোর্ড অব পিস’-কে ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রকাশের সুযোগ দিলেন- যে পরিকল্পনায় গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে এবং হামাসের ভারী অস্ত্র ‘নিরস্ত্রীকরণ ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া’র কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয় এ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর দেয়া ঘোষণার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপে মন্ত্রিসভার দুই সদস্য বেজালেল স্মোটরিচ ও ওরিত স্ত্রক ঘোষণা করেছেন, গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী প্রবেশের অনুমোদন দেয়ার সময় নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ‘ভুল তথ্যের’ ভিত্তিতে। রোববার নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বলেন, ইসরাইল ১৫ দফা প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি আরও বলেছেন, হামাসকে ‘বাস্তব ও কাল্পনিক নয়’- এমন নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, গাজা বা জুদিয়া ও সামারিয়ায় কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।

স্মোটরিচ দ্রুত নেতানিয়াহুকে ডান দিক থেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে তার দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের জন্য অভিনন্দন জানাই। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে ইসরাইল রাষ্ট্র এই রোডম্যাপ গ্রহণ করছে না।

তবে এই পর্যায়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সঙ্গে ইসরাইলের অন্যান্য প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য কতটা, তা স্পষ্ট নয়। ওইসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীকে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে এবং ঠিকাদারদের ওই এলাকায় অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার অনুমতি দিতে রাফাহর আশপাশের কিছু এলাকা থেকে আংশিক সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

মনে হচ্ছে, গাজাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন নেতানিয়াহু। সূত্রগুলো বলছে, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর আমরা ১৫ দফার নথিটি পেয়েছি। তারা প্রত্যাহার চেয়েছে, কিন্তু আমি এতে সম্মত নই। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবেন না- যদি সেগুলো আমাদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। তবে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির, যিনি নিজেও নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে রয়েছেন, প্রতিবাদ করে বলেন, তার দৃষ্টিতে এটি যথেষ্ট নয়।

রোববারের মন্ত্রিসভা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এমন এক সময়ে, যখন ডানপন্থী দলগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিমধ্যে কিছু ক্ষতি সামাল দেয়া হয়ে গেছে। এর আগের সপ্তাহে ‘বোর্ড অব পিস’ গাজা চুক্তির মূল ভাষা পরিবর্তন করে জানায়, হামাস নিরস্ত্র হওয়ার পরই ইসরাইলকে ‘ইয়েলো লাইন’ এবং গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। হামাসের সঙ্গে মূল চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইসরাইল পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং একই সময়ে হামাসও নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া চালাবে। প্রথমে ‘বোর্ড অব পিস’ একটি বিবৃতিতে বলেছিল, নিরস্ত্রীকরণের পর ইসরাইলকে ইয়েলো লাইন থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই বিবৃতিটি সম্পাদনা করে ‘সম্পূর্ণ’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়।

যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন চাপের মুখে নেতানিয়াহুকে একাধিকবার পিছু হটতে হয়েছে। বারবার তিনি ইসরাইলের ইরান, লেবানন ও গাজায় হামলার মাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু হোয়াইট হাউস তাকে থামিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একবার ইরানের উদ্দেশে উড্ডয়ন করা যুদ্ধবিমানগুলোকে শেষ মুহূর্তে ফিরে আসার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কারণ ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এর প্রতিবাদ করেছিলেন। অক্টোবরে ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জনের আগেই গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে সম্মত হন নেতানিয়াহু। এর বিনিময়ে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার চুক্তি হয়। একই সঙ্গে কাতারের মাটিতে হামাস নেতাদের ওপর হামলা চালানোর জন্য কাতার সরকারের কাছে অপমানজনকভাবে ক্ষমা চাইতেও তাকে সম্মত হতে হয়। লেবাননে চলমান লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও নেতানিয়াহু জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে তার হাত-পা বাঁধা নেই।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইল লেবাননে শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং আলি তাহের রিজসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের নির্মূল করেছে। তবে তিনি যে অভিযানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছিলেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা না দিয়ে দ্রুতই অস্পষ্ট ও রহস্যময় বক্তব্যের আড়ালে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমি বিস্তারিত জানাতে পারছি না। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযানের মাঝামাঝি রয়েছি। আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করছি এবং হুমকি নির্মূল করছি। নেতানিয়াহুর জন্য এখন মিশনটি পরিষ্কার: নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করা এবং ডানপন্থীদের যতটা সম্ভব কম ছাড় দেয়া- এই আশায় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একসময় তার ওপর চাপ কমিয়ে দেবে। তবে এই মুহূর্তে ট্রাম্প তাকে কোনো সুবিধা দিতে খুব একটা আগ্রহী নন। আগের বৈঠকগুলোতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে একের পর এক প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। এমনকি তার ফৌজদারি মামলায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে নেতানিয়াহুকে আগাম ক্ষমা করে দেয়ার জন্য চাপ দেয়ারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার এই অংশীদারের প্রতি সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের আচরণে শীতলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মাসে হোয়াইট হাউসে তাদের বৈঠকটি লিকুদের নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সূচনার মতো হওয়ার কথা ছিল। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের নেতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেয়ার কৃতিত্ব দেখানোর সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল নেতানিয়াহুর। বাস্তবে বৈঠকটি তুলনামূলকভাবে কম প্রচারের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমের সামনে কোনো যৌথ ঘোষণা দেয়া হয়নি, এমনকি প্রকাশ্য স্নেহ বা ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শনও দেখা যায়নি।

এটাই হয় যখন একই সময়ে অনেকগুলো বল সামলানোর চেষ্টা করা হয়- একসময় কিছু না কিছু হাত থেকে পড়ে যেতেই শুরু করে।

(অনলাইন হারেৎস থেকে অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন