বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা সেই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট চক্রের। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় আরও কঠিন। আদালতে অভিযুক্ত হন একজন, অথচ সন্দেহের চোখে পড়েন হাজারো নিরপরাধ বাংলাদেশি।
সম্প্রতি পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে এক বিদেশি নাগরিককে অপহরণ, দুই দিন আটকে রেখে নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তারের খবর সামনে এসেছে। পর্তুগালের জুডিশিয়াল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন টাকা’ নামে অভিযানে ৩৫ ও ৪৩ বছর বয়সী দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং তার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালতেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এমন ঘটনা যে বিদেশে বসবাসরত সাধারণ বাংলাদেশিদের অস্বস্তিতে ফেলে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো আবেগের বিষয় নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিবাসন, আইনশৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং লাখো প্রবাসীর ভবিষ্যৎ।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা শুনলেই গা শিউরে ওঠে শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, মাদক, প্রতারণা, অস্ত্র, জালিয়াতি, চুরি, হামলা। এদের ‘খারাপের চেয়েও খারাপ’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এই একটি বাক্যই বাংলাদেশের জন্য কত বড় অপমান তা কি আমরা উপলব্ধি করছি?
অপরাধীর দায় অপরাধীরই! প্রথম কথাটি স্পষ্ট হওয়া দরকার একজন বাংলাদেশি অপরাধ করলে তার দায় পুরো বাংলাদেশি জাতির নয়।
বিদেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি সততার সঙ্গে কাজ করছেন। নির্মাণশ্রমিক থেকে চিকিৎসক, রেস্তোরাঁকর্মী থেকে প্রকৌশলী, কৃষিশ্রমিক থেকে প্রযুক্তিকর্মী, বিভিন্ন পেশায় তারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। পরিবারের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তৈরি করছেন।
তাই কোনো অপরাধের ঘটনায় ‘বাংলাদেশিরা এমন’ এমন সাধারণীকরণ যেমন অন্যায়, তেমনি ‘কয়েকজনের ঘটনা, তাই গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই’, এই মনোভাবও বিপজ্জনক। কারণ অপরাধ ব্যক্তির হলেও তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
একজন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে অন্য বাংলাদেশিদের ওপরও। বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ, কঠোর কাগজপত্র যাচাই, চাকরির ক্ষেত্রে সংশয় কিংবা সামাজিক অবিশ্বাস, এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারেন নিরপরাধ মানুষও। এখানেই সমস্যার গভীরতা।
বিদেশে বাংলাদেশি পরিচয় কি সন্দেহের কারণ হবে?
একজন ভিসা কর্মকর্তা যখন কোনো বাংলাদেশি আবেদনকারীর কাগজপত্র দেখবেন, তার বিচার হওয়া উচিত ওই ব্যক্তির যোগ্যতা, নথি ও আইনি অবস্থার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের সিদ্ধান্ত সবসময় এতটা যান্ত্রিক নয়। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অপরাধের পরিসংখ্যান মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে।
এ কারণে কোনো দেশের নাগরিকদের নিয়ে যদি ধারাবাহিকভাবে অপরাধের খবর সামনে আসে, তা সেই দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্যও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এখানে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো কারণ নেই। কিন্তু আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে, অপরাধের পৃথক ঘটনাগুলো যদি ধীরে ধীরে একটি নেতিবাচক স্টেরিওটাইপ তৈরি করে।
একজন শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যেতে চাইছেন। একজন দক্ষ কর্মী চাকরি খুঁজছেন। একজন ব্যবসায়ী নতুন বাজারে প্রবেশ করতে চাইছেন। তাদের যেন শুধু জাতীয়তার কারণে সন্দেহের মুখে পড়তে না হয়, এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
কেন কিছু মানুষ অপরাধচক্রে ঢোকে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। অবৈধ অভিবাসন, দালালের প্রতারণা, বিপুল ঋণ, বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া, বেতন না পাওয়া কিংবা অনিশ্চিত বসবাস, এসব কারণে কেউ কেউ চরম চাপের মধ্যে পড়েন। অপরাধী চক্রগুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। আবার এর বিপরীত বাস্তবতাও আছে।
অনেকে বিদেশে গিয়ে দ্রুত অর্থবান হওয়ার সামাজিক চাপ অনুভব করেন। দেশে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা থাকে বিদেশে গেছে মানেই টাকা আসবে, বাড়ি হবে, জমি হবে, জীবন বদলে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু বিদেশে জীবন সবসময় ছবির মতো নয়। বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার বড় ফারাক তৈরি হলে কেউ কেউ শর্টকাটের পথে যেতে পারেন। আর সেখানেই অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রবেশ।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক চাপ অপরাধের অজুহাত নয়। যে ব্যক্তি অপহরণ করে, মাদক ব্যবসায় যুক্ত হয়, যৌন সহিংসতা করে, প্রতারণা বা জালিয়াতি করে, তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। পরিস্থিতি বোঝা আর অপরাধকে বৈধতা দেওয়া এক বিষয় নয়।
অপরাধ এখন আর শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়, সাম্প্রতিক অনেক ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট অপরাধের চরিত্র বদলেছে।
এক দেশে বসে অন্য দেশে থাকা ব্যক্তিকে টার্গেট করা যায়। বাংলাদেশ থেকে অর্থ লেনদেন করে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা কাউকে ভয় দেখানো যায়। ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের একটি অপরাধচক্র পরিচালনা করা সম্ভব। অর্থাৎ অপরাধ এখন অনেক ক্ষেত্রেই ‘ট্রান্সন্যাশনাল’।
এই বাস্তবতায় শুধু বিদেশের পুলিশ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন, মানবপাচার, সাইবার প্রতারণা, মুক্তিপণ, জাল কাগজপত্র এবং সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে আইন শেখানো হয় কি? এখানে রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যান। তাদের অনেকেই যাওয়ার আগে জানতে চান কোথায় কাজ করবেন, কত বেতন পাবেন, কীভাবে ভিসা হবে। কিন্তু স্থানীয় আইন সম্পর্কে তাদের কতটা প্রস্তুত করা হয়? কোন আচরণ ফৌজদারি অপরাধ? পুলিশ আটক করলে কী করতে হবে? কোন ধরনের আর্থিক লেনদেন বিপজ্জনক? ভিসার শর্ত ভাঙলে কী হতে পারে?
মাদক, যৌন অপরাধ, সহিংসতা, প্রতারণা বা জালিয়াতির শাস্তি কী? অনেক অভিবাসী এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর নিয়ে বিদেশে যান না। এটি পরিবর্তন করতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক আইনি ও সামাজিক সচেতনতা প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। শুধু একটি সার্টিফিকেট দিয়ে দায় শেষ না করে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দরকার। গন্তব্য দেশের ভাষা, আইন, শ্রম অধিকার, জরুরি যোগাযোগ এবং দূতাবাসের সহায়তা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা প্রত্যেক অভিবাসীর অধিকার।
দূতাবাসের কাজও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রবাসীদের কাছে দূতাবাস যেন শুধু পাসপোর্ট নবায়নের জায়গা না হয়। একজন নতুন অভিবাসী বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হলে কোথায় যাবেন, তা জানা দরকার। কোনো শ্রমিক বেতন না পেলে কার কাছে অভিযোগ করবেন, কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা পাবেন, কোনো বাংলাদেশি অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়লে বা তার শিকার হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এসব বিষয়ে কার্যকর সহায়তা কাঠামো থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত বাংলাদেশি চক্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দূতাবাসগুলোর তথ্যভিত্তিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রবাসী কমিউনিটিরও দায় আছে। সব দায় সরকারের নয়। প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো অপরাধী শুধু ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ের কারণে সামাজিক আশ্রয় পাবে, এমন সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
অপরাধীকে লুকানো, ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো কিংবা তদন্তে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই কমিউনিটির স্বার্থ রক্ষা করে না। বরং এতে পুরো সম্প্রদায়ের ওপর সন্দেহ বাড়ে।
সৎ প্রবাসীদের উচিত অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। কারণ একটি কমিউনিটির সম্মান শুধু তার সফল ব্যবসায়ী বা পেশাজীবীদের দিয়ে তৈরি হয় না; তারা অপরাধের বিরুদ্ধে কতটা আপসহীন, সেটিও তার পরিচয়ের অংশ। ‘বিদেশে আছে’ মানেই সম্মানিত, এই ধারণা বদলাতে হবে।
বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে, বিদেশে থাকেন মানেই তিনি সফল, সম্মানিত এবং অর্থবান।
এই ধারণা বিপজ্জনক। প্রবাসী হওয়া কোনো নৈতিক সার্টিফিকেট নয়। বিদেশে থাকা একজন সৎ শ্রমিক যেমন সম্মানের যোগ্য, তেমনি অপরাধে জড়িত একজন উচ্চশিক্ষিত বা অর্থবান ব্যক্তিও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
আমাদের পরিবার ও সমাজকে এই পার্থক্য বুঝতে হবে। বিদেশ থেকে টাকা পাঠালেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। সেই টাকা বৈধ পথে আসছে কি না, ব্যক্তি কীভাবে জীবনযাপন করছেন, তিনি স্থানীয় আইন মানছেন কি না এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের বোঝা নন; তারা দেশের বড় সম্পদ। তাদের শ্রম, মেধা ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই কয়েকজনের অপরাধের কারণে পুরো প্রবাসী সমাজকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করে সমস্যাকে ছোট করে দেখাও আত্মঘাতী।
আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত একেবারে পরিষ্কার, অপরাধ করলে বিচার হবে। পরিচয় যাই হোক, ছাড় নেই।
একই সঙ্গে একজনের অপরাধের দায় লাখো নিরপরাধ মানুষের ওপর চাপানো যাবে না।
রাষ্ট্রকে অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে। বিদেশগামীদের আইনি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দালাল ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। প্রবাসী সংগঠনগুলোকে অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে হবে। আর সমাজকে বুঝতে হবে, বিদেশে বাংলাদেশি পরিচয় শুধু পাসপোর্টের পরিচয় নয়; এটি আচরণেরও পরিচয়।
আজ একজন বাংলাদেশি যদি বিদেশের মাটিতে অপরাধ করে, আদালতে শাস্তি পাবে সে। কিন্তু তার কাজের প্রতিধ্বনি হয়তো পৌঁছাবে আরও বহু মানুষের দরজায়। তাই কয়েকজনের অপরাধকে পুরো জাতির পরিচয় হতে দেওয়া যাবে না। আবার কয়েকজনের অপরাধকে ‘কিছুই হয়নি’ বলে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যাবে না। অপরাধীর বিচার চাই, নিরপরাধ প্রবাসীর মর্যাদাও চাই। এই দুই দাবির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে দুটিই সমান জরুরি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
