দক্ষিণাঞ্চলের স্বনামধন্য খুলনা পাবলিক কলেজে সিনিয়র ছাত্রদের হাতে শিশু শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ অভিযোগ করেছেন ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার ওই বিদ্যাপীঠের স্কুল শাখার চতুর্থ শ্রেণির ডি সেকশনের ছাত্র মোহাম্মাদ আয়মানের মা লায়লা খাতুন। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে।
খুলনা মহানগরীর খালিশপুর নেভিগেটের বাসিন্দা লায়লা খাতুন রোববার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওই বিদ্যাপীঠের ৩-৪ জন অজ্ঞাতনামা ছাত্র প্রায় দু’মাস ধরে আমার ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে মাদক কেনার জন্য বাধ্য করে এবং তাকে জোর করে মাদক সেবন করায়।
সন্তানকে প্রায় সময় জোর করে সিগারেট খাওয়ায়। তিনি বলেন, গত ২রা আগস্ট আনুমানিক সকাল ৯টা ১০ মিনিটের সময় কলেজ ছুটি শেষে অজ্ঞাতনামা একজন ছাত্র মাদক কেনার জন্য আমার ছেলেকে ৮৬০ টাকা দেয়। পরবর্তীতে আমার ছেলে বাসায় এসে ওই অজ্ঞাতনামা ছাত্রদের দেয়া টাকা দেখায় এবং বলে মাদক কেনার জন্য অজ্ঞাতনামা ছাত্ররা তাকে দিয়েছে। তাৎক্ষণিক আমি আমার ছেলেকে কেন দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে, বিস্তারিত সবকিছু বলে। আমার ছেলে জানায় অজ্ঞাতনামা ছাত্ররা ৩রা আগস্ট স্কুলে আসবে মাদক নেয়ার জন্য। ছেলে আরও জানায়, তারা ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। ছেলে বাসা থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তারিখে প্রায় নগদ এক লাখ টাকা এবং ৬ আনা ওজনের দুইটি স্বর্ণের আংটি অজ্ঞাতনামা ওই ছাত্রদের দেয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ছেলের কাছ থেকে এমন লোমহর্ষক ঘটনা জানতে পেরে তাৎক্ষণিক পাবলিক কলেজের প্রিন্সিপাল এবং অন্যান্য শিক্ষকদের বিষয়টি অবহিত করি। পরবর্তীতে শিক্ষকরা আমার ছেলেকে নিরাপত্তা দিবে বলে আশ্বস্ত করে। কিন্তু পরের দিন ৩রা আগস্ট টিফিন টাইমে ছেলে ক্লাসের বাইরে গেলে অজ্ঞাতনামা ওই ছাত্ররা কৌশলে সকল শিক্ষকদের ফাঁকি দিয়ে তাকে সিঁড়ি থেকে তিনতলায় ওয়াশ রুমে নিয়ে গিয়ে মাদক চায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, মাদক দিতে না পারায় ক্ষিপ্ত হয়ে তার ছেলেকে চাকু দিয়ে শরীরের ডান, বাম পায়ের উরু এবং বুকের বাম পাশে আঘাত করে। ফলে শার্ট এবং প্যান্ট কেটে যায়।
কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত শরীরের কোথাও ক্ষত হয়নি। ওই শিক্ষার্থীরা হুমকি দিয়ে বলে, ভবিষ্যতে তাদের অবাধ্য হলে এবং বিষয়টি কাউকে অবগত করলে প্রাণে মেরে ফেলবে। পরবর্তীতে অজ্ঞাতনামা ছাত্ররা তাকে পরেরদিন নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং ১০ পিস ইয়াবা এনে দেয়ার কথা বলে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আমরা পাবলিক কলেজ এর প্রশাসনকে অবগত করি এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলে কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি কলেজের উপাধ্যক্ষ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। পরবর্তীতে উপায়ান্তর না পেয়ে আমার ছেলের জীবনের নিরাপত্তার জন্য খালিশপুর থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। অভিযোগটির তদন্ত চলছে।
লায়লা খাতুন বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি ওই বিদ্যাপীঠের সিনিয়র ছাত্রদের দ্বারা ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়। ছোট বাচ্চাদের জোর করে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। শিশুদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং মাদকদ্রব্য আনতে বাধ্য করায়। শিশুদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পাশের একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। আর এসব কথা অভিভাবকদের কাছে প্রকাশ করা হলে জীবনে শেষ করে দেয়ার হুমকি দেয়। যার কারণে শিশু শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাউকে কিছু বলে না। আর এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির কতিপয় ছাত্র জড়িত।
এসব কারণে স্বনামধন্য এই বিদ্যাপীঠটি আজ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এদিকে পাবলিক কলেজের নিজস্ব ফেসবুক পেজে অধ্যক্ষ লে. কর্নেল মুনীর আব্বাস (পিএসসি) স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ওই শিক্ষার্থীর মায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রেণি শিক্ষক ও দু’জন ক্লাস শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ৩রা আগস্ট টিফিন টাইমে আয়মানকে বাথরুমে নিয়ে মারধরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। আয়মানের ব্যাগে একটি ব্লেড ও একটি মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে (যে নম্বরে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার কথা ছিল)। ফোন নম্বরটি তার চাচার। অভিযোগের বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে।
