একটি ছোট্ট বকপাখি। তাকে ঘিরে ১১ বছরের শিশু বাঁধন আলীর কতো স্বপ্ন, কতো মায়া! নাটোর রাজবাড়ীতে পড়ে থাকা অসহায় পাখিটিকে দেখে মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছিল তার মন। বাড়িতে এনে কী খাওয়াবে, কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে- সেই চিন্তায় বিভোর ছিল সে। ফুপাতো ভাইয়ের কাছে জানতে পারে, বকের প্রিয় খাবার মাছ। শনিবার সেই মাছ ধরতে যাওয়া যে তার শেষ যাওয়া হবে, কে জানতো তা!
গত বৃহস্পতিবার খামারি বাবা রিপন আহমেদ বাবু ও মা রিনি বেগমের একমাত্র ছেলে বাঁধন বেড়াতে যায় নাটোরের দত্তপাড়া গ্রামে ফুপুর বাড়িতে। পরদিন ফুপাতো ভাইদের সঙ্গে নাটোরের রাজবাড়ীতে ঘুরতে গিয়ে একটি ছোট্ট বকপাখিকে পড়ে থাকতে দেখে সে। অসহায় পাখিটিকে দেখে মায়া হয় বাঁধনের। পরম যত্নে সেটিকে নিয়ে আসে বাড়িতে।
বকটি কী খাবে তা নিয়ে বাড়ির বড়দের কাছে নানা প্রশ্ন করে বাঁধন। ফুপাতো ভাই প্রান্ত সরকার তাকে জানায়, বকের প্রিয় খাবার মাছ। এ কথা শুনে পণ্য পরিবহনের নেটের জালি পাটকাঠির সঙ্গে বেঁধে সে তৈরি করে মাছ ধরার জাল। সেই জাল নিয়ে প্রতিবেশী বন্ধু রোহানের সঙ্গে আধা কিলোমিটার দূরের চন্দনা খালে যায় সে। মাছ ধরতে গিয়ে একপর্যায়ে হঠাৎ পা পিছলে পানিতে পড়ে যায় বাঁধন। তাকে উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা করে বন্ধু রোহান। কিন্তু ছোট্ট হাতে বন্ধুকে টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ছুটে গিয়ে স্বজনদের খবর দেয় সে। স্থানীয়রা দ্রুত খালের কাছে ছুটে যান। প্রতিবেশী সুমন খালের তলদেশ থেকে বাঁধনকে উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কিন্তু সব আশা নিরাশায় পরিণত করে তার চলে যাওয়ার কথা জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক।
ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। বাড়ির উঠানে ক্যারেটে রাখা সেই বকপাখিটির দিকে তাকিয়ে কান্না থামাতে পারছেন না বাবা। বাঁধনের একমাত্র বোন বাবলি খাতুনও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে পাখিটির দিকে। যে বকটিকে বাঁচাতে গিয়ে ভাইয়ের জীবন চলে গেল, সেই পাখিটিই এখন পরিবারের শোকের নীরব সাক্ষী। ফুপাতো ভাই প্রান্ত সরকার মানবজমিনকে বলেন, বকের প্রিয় খাবার মাছ জানতে পেরে বাঁধন নিজেই মাছ ধরতে খালে যায়। সেখানে হঠাৎ পানিতে পড়ে গেলে রোহান তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বঁধন ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্নের সন্তান। বাবা রিপন আহমেদ বাবুর স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। মানুষের সেবা করবে। অথচ একটি ছোট্ট বকপাখির জন্য মাছ ধরতে গিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সেই থেমে গেল সেই স্বপ্নযাত্রা। বঁধনের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া রোহানও একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। চোখের সামনে বন্ধুর পানিতে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে। বাড়ির উঠানে রাখা বকপাখিটি হয়তো এখনো জানে না, তার জন্য খাবার জোগাড় করতে যে শিশুটি ছুটে গিয়েছিল খালের পাড়ে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। বাঁধনের এমন মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ বড়বড়িয়া গ্রাম ও বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
