বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাছ ধরার জন্য যে চাঁদাবাজি ও চর দখলের অভিযোগ ছিল- ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরও একই অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার স্থানীয় বিএনপি’র এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বনবিভাগের চরমোন্তাজ রেঞ্জের আওতাধীন চর হেয়ার ও চর আগারা এলাকায় জেলেদের ইলিশ-চিংড়িসহ সামুদ্রিক মাছ ধরতে হলে দিতে হবে লাখ লাখ টাকা চাঁদা। আর সেই টাকা না দিলে জুটছে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি। অভিযুক্ত নেতার নাম মো. শাহজালাল মীর। তিনি রাঙ্গাবালী দক্ষিণ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক। বৈধভাবে ইজারা নেয়া চরে ইলিশ মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে ৬ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গত ২২শে জুলাই জেলেদের পক্ষে রাঙ্গাবালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন আ. আজিজ মাহমুদ। শাহজালাল মীর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আ. রহমান ফরাজীর অনুসারী।
বনবিভাগের সূত্র মতে, চলতি বছরের জুলাই মাসে বনবিভাগের চরমোন্তাজ রেঞ্জ থেকে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে চর হেয়ার ও চর আগারা এলাকাটি এক বছরের জন্য মাছ ধরার উদ্দেশ্যে ইজারা নেন আ. আজিজ মাহমুদ ও আ. মান্নান ঢালী। ইজারার মেয়াদ চলতি বছরের ১লা জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত। জেলে হাসান গাজী বলেন, কাগজপত্রে দেখা গেছে চর কলাগাছিয়া মাছ ধরার অনুমতি পেয়েছেন আ. আজিজ মাহমুদ ও আ. মান্নান ঢালী। আমরা তাদের অধীনে কর্মরত জেলে। মাছ ধরতে গেলে শাহজালাল মীর বাধা দিয়ে ৬ লাখ টাকা দাবি করেন এবং অস্বীকৃতি জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেন। তার দাবি, ওই চরে শাহজালাল মীরের একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ সক্রিয় রয়েছে।
একই অভিযোগ করেন আরেক জেলে রাজীব খান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শাহজালাল মীর একইভাবে চর দখলে রাখতেন, এখনো অবৈধভাবে সেই দখলিস্বত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। তার নির্যাতনে জেলেরা অতিষ্ঠ। মৎস্য ব্যবসায়ী আ. মান্নান ঢালী সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে বৈধভাবে চর হেয়ার ও চর আগারা ইজারা নেয়ার পরও শাহজালাল মীর ও তার লোকজন জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দিচ্ছেন এবং ৬ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছেন। টাকা না দেয়ায় জেলেদের মারধর করে চর থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। আ. মান্নান ঢালী আরও বলেন, এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একই চর তিনি ইজারা নিয়েছিলেন।
তখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করে জেলেদের মারধর করে চর দখলে নেন শাহজালাল মীর। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ‘সাগর ইজারা দিয়েছেন এমপি’ শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল, যার নেপথ্যেও শাহজালাল মীর ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এলাকায় ‘সাগরের সন্ত্রাস’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তিকে টাকা না দিয়ে সাগর বা নদীতে জাল ফেলতে পারেন না জেলেরা বলেও অভিযোগ তার। থানায় লিখিত অভিযোগকারী ব্যবসায়ী আ. আজিজ মাহমুদ বলেন, আমাদের জেলেরা ইজারা নেয়া চরে মাছ ধরতে গেলে তাদের মারধর করে চর থেকে তুলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় গত ২২শে জুলাই রাঙ্গাবালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। অভিযোগকারীর দাবি, পুলিশ একাধিকবার ডেকে পাঠালেও অভিযুক্তদের থানায় হাজির করাতে ব্যর্থ হয়েছে। চাঁদামুক্ত, মারধর ও দখল-বাণিজ্যমুক্ত পরিবেশে মাছ আহরণের সুযোগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। অভিযোগের বিষয়ে শাহজালাল মীর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও তিনি টাকা দিয়ে ওই চরে মাছ ধরতেন, এখনো একইভাবে মাছ ধরছেন। তিনি স্বীকার করেন, এ বছর আ. আজিজ মাহমুদ ও আ. মান্নান ঢালী চরে মাছ ধরার অনুমতিপত্র পেয়েছেন। তবে তার দাবি, উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আ. রহমান ফরাজী তাকে চরে মাছ ধরতে বলেছেন এবং তাকে ‘অনুমতিপত্র’ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে তিনি মারধর কিংবা চাঁদা চেয়েছেন এমনটি সত্য নয়। বিএনপি নেতা ও তার অনুসারীর চর দখলের বিষয়ে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আ. রহমান ফরাজীকে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। পরে তিনি বলেন, চর নিয়ে কোনো মন্তব্য করলে সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসিম উদ্দীন বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিবাদীকে একাধিকবার থানায় ডাকা হলেও তিনি হাজির হননি। চরমোন্তাজ রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে যারা চরে মাছ ধরার অনুমতি পেয়েছেন, কেবল তারাই সেখানে মাছ ধরার অধিকারী।
