জুলাই স্মৃতি জাদুঘর যেন দলীয় ইতিহাস চর্চার জায়গা না হয়, জাতীয় ইতিহাস চর্চার জায়গা হয় বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রকৃত সত্যটাই যেন আসে এবং সবাই যেন ধারণ করতে পারে। গতকাল বেলা ১১টার পর জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। জাদুঘর পরিদর্শনের শুরুতে গণভবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেছেন এনসিপি’র নেতারা। এ সময় জুলাই জাদুঘরের লাল টেলিফোনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন কথোপকথনের অডিও শুনেছেন এনসিপি ও ছাত্রনেতারা। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ওই কক্ষে গিয়ে লাল টেলিফোনে কান পাতেন। নাহিদ ইসলাম নম্বর ডায়াল করে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনেন। এনসিপি’র নেতা সাইফুল্লাহ হায়দার লাল টেলিফোন কানে দিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান জানান। তারা ঘুরে ঘুরে দেখেছেন জাদুঘরের নানা কক্ষ। নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সকালে জুলাই জাদুঘর প্রাঙ্গণে আসেন এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, মাহিন সরকার, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারসহ কয়েকজন।
প্রথমে জাদুঘর চত্বরে থাকা বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের বর্ণনাসংবলিত গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, জাদুঘরের সামনে থাকা প্রতীকী কবর এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন আইকনিক ছবির আদলে নির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য ঘুরে দেখেন তারা।
জাদুঘরের ফটকে ঢুকতেই দেখা যায় থ্রিডি প্রজেকশনের মাধ্যমে গণভবনের ৫ই আগস্ট-পরবর্তী অবস্থা। এরপর প্রথম কক্ষে ছিল ‘শেখ হাসিনার সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অপকর্ম ও ভূমিকার’ একটি সংক্ষিপ্ত অ্যানিমেশন ভিডিও, পাশে ছিল প্রতীকী খুলি।
প্রথম কক্ষটি ঘুরে দেখার পর এনসিপি নেতারা ডান দিকের একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে মেঝেতে শক্ত কাঁচের নিচে আছে ৫ই আগস্ট বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার হাতে চুরমার হওয়া তৎকালীন গণভবনের ইটপাথর, কাঁচ ইত্যাদি। কক্ষটিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন আলোকচিত্র, গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন ফাইলের কপি রয়েছে। এ ছাড়া, ডিজিটাল স্ক্রিনে চলছিল জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ। ওই কক্ষ থেকে পেছনের দিক দিয়ে এনসিপি’র নেতারা প্রবেশ করেন আরেকটি অংশে। সেখানে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ২০১৯ সালে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী উপস্থাপন, রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়নের বিভিন্ন আলোকচিত্রের সংগ্রহ রয়েছে। ওই অংশে একটি ছোট ডিজিটাল স্ক্রিনে চলছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিভিন্ন ক্লিপ।
জাদুঘরের দক্ষিণ দিকের অংশে যান এনসিপি নেতারা। ওই অংশটিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিক্যাপিংসহ (কোনো ব্যক্তির হাঁটু বা পায়ের সংযোগস্থলে অস্ত্র দিয়ে গুলি করে বা আঘাত করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেয়া) ভয়াবহ নির্যাতন ও গুমের চিত্র এনসিপি’র নেতারা ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। এরপর তারা যান ‘লাল টেলিফোন কক্ষে’। এই কক্ষটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিসকক্ষ। সেখানে তিনটি আলাদা টেবিলে ছয়টি লাল টেলিফোনের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের নাম ও নম্বরের তালিকা আছে। নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যায়।
‘জুলাইয়ের সংগ্রহ’: জুলাই জাদুঘরের নিচতলা ঘুরে দেখার পর দ্বিতীয় তলায় যান এনসিপি নেতারা। দ্বিতীয় তলায় উঠে ডান দিকে প্রথম যে কক্ষটিতে এনসিপি নেতারা প্রবেশ করেন, সেখানে চারদিকের দেয়ালের পর্দায় ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ। নাহিদসহ এনসিপি’র নেতারা কিছুক্ষণ সেই ভিডিওগুলো দেখেন। এই কক্ষটির পাশের অংশে রয়েছে আলোচিত কার্টুনিস্ট দেবাশিস চক্রবর্তীর তৈরি করা ‘জুলাইয়ের পোস্টারের’ সংগ্রহ। সেখানে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিচয়পত্র, হাতঘড়ি, মুঠোফোন, টুপি, জার্সি, গামছা, ওয়ালেট, জ্যাকেট, প্যান্ট, কোট, টাই ও শার্টের পাশাপাশি শহীদ শ্রমজীবীদের ছবির সংগ্রহ, জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক কর্মীদের ছবির সংগ্রহ রয়েছে। এসবের সঙ্গে পাশে থাকা ‘জুলাইয়ের টাইমলাইন’ও ঘুরে দেখেন এনসিপি’র নেতারা। এই অংশে একটি কক্ষে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকাসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে।
এনসিপি নেতারা সবশেষে জাদুঘরের যে অংশে প্রবেশ করেন, সেই অংশটি মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত। সেখানে কয়েকটি কক্ষে ও বাইরে শহীদকে বহনকারী রিকশা, শহীদদের জুতা, বই, সুরমা, রবিক্স কিউব, ভলিবল, গ্লাভস, কাপ, মগ, কাপ-পিরিচ, প্লেট, চশমা ইত্যাদির সংগ্রহ ঘুরে ঘুরে দেখেন তারা। দ্বিতীয় তলার একদম শেষপ্রান্তে শেখ হাসিনার পাঠকক্ষও ঘুরে দেখেন এনসিপি নেতারা। সেখানে শহীদ আবু সাঈদের পড়ার টেবিল ছিল।
এরপর এনসিপি নেতারা জাদুঘর চত্বরে থাকা প্রতীকী আয়নাঘর, টিএফআই সেল, এগজস্ট ফ্যান পরিদর্শন করেন। শেষে চত্বরে থাকা জুলাই অভ্যুত্থানের এক দফা দাবি ঘোষণার ছবির গ্রাফিতি পরিদর্শন করেন এনসিপি’র নেতারা। এরপর তারা জাদুঘর কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখানে প্রায় আধঘণ্টা আলোচনার পর বেলা ১১টার পর জাদুঘরের মূল ফটকে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদসহ দলটির নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই গণভবন থেকে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী সব সিদ্ধান্ত নিতো। মানুষকে লুটপাট, অর্থ লুটপাটসহ সব সিদ্ধান্তই নিতো। অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেয়। আমরা সংসদে এবং বাইরে প্রচুর কথা বলেছি জাদুঘরটি খুলে দেয়ার জন্য। আমি এর আগেও এখানে এসেছিলাম। নির্বাচনের পর কিছু পরিবর্তন সরকার করেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এখানে সীমান্ত হত্যার সেগমেন্ট ছিল, সীমান্তে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে- সেগুলোর স্মৃতি, মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিএনপি’র আন্দোলন সংগ্রামটাকে একটু বেশি দেখানো হয়েছে। বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ ছিল তার সঙ্গে ভারত জড়িত ছিল। বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে। সরকার ভাবছে এগুলো করে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে পারবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো বা খারাপের বিষয় না। সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ।
জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যেসব স্মৃতি রাখা হয়েছে সেগুলোকে আরও বিস্তারিত দেখানো উচিত। টাইমলাইন ধরে ধরে বিভিন্ন জেলায়, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সবকিছুকে আনা উচিত। এখানে কেন্দ্রীয় বা পরিচিত মুখগুলো বারবার এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা জাদুঘরের দায়িত্বে আছে তাদের আমরা বিষয়টি বলেছি। জাদুঘরে যথেষ্ট পরিমাণ জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। আমরা সংসদে বলেছিলাম এটি স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘর হওয়া উচিত।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যারা জুলাই স্পিরিটকে ধারণ করেন সেই ধরনের লোকদের দিয়ে এই জাদুঘর পরিচালনা করতে হবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
