বিএনপি’র দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি শোডাউনে উত্তপ্ত দিরাই

১৪৪ ধারা জারি

বিএনপি’র দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি শোডাউনে উত্তপ্ত দিরাই

ফন্ট সাইজ:

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবার প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। গত এক মাস ধরে উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র কার্যক্রম পৃথকভাবে পরিচালনা, পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দিরাইয়ের রাজনৈতিক অঙ্গন। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিরাই পৌর এলাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে উপজেলা প্রশাসন। শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার কথা ছিল। দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জীব সরকার স্বাক্ষরিত আদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বাধীন পক্ষের নেতাকর্মীরা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি পালন করেন।

পৌরসভার বাগানবাড়ী কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র একাংশের উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা বিএনপি’র প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক ও এডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল সমর্থিত নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ওই সমাবেশে সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীকে রাখা হয়নি। এর আগে গত ৬ই আগস্ট সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর নেতৃত্বে উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র উদ্যোগে শোডাউন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচিতে উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক আমির হোসেন, ফারুক সর্দার, হুমায়ুন কবির তালুকদার, শাহ্‌ আলম, মজিবুর রহমানসহ দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করেই দলের মধ্যে এই বিভক্তির সূত্রপাত হয়েছে।

একপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী পারভীন আক্তার। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন তার সৎ ভাই ও উপজেলা বিএনপি’র প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক। এ পক্ষের সঙ্গে মনোনয়নবঞ্চিত এডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেলও রয়েছেন বলে চাউর রয়েছে। গত ৬ই আগস্টের সমাবেশে নাছির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, যারা আলাদা সভা করবে, তারা বিএনপি’র কেউ নয়। তারা দলকে বিভক্ত করে ক্ষতি করতে চায়। এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। নিজের পারিবারিক বিরোধের প্রসঙ্গ টেনে নাছির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, আমি একা, আমার কোনো ভাই নেই। ষড়যন্ত্র করে আমার বাসাও কেড়ে নিয়েছে তারা। এ সময় তার স্ত্রী পারভীন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ২০২৫ সালে তার স্বামী নাছির চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ থাকাকালে তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে এলে মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক তাকে এবং তার দুই মেয়ে নাজিয়া চৌধুরী ও নাদিয়া চৌধুরীকে মারধর করে গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তবে পারভীন আক্তারের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক।

শনিবারের সমাবেশে তিনি বলেন, দলের পদধারী নেতারা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিনিধি। তাদের বাদ দিয়ে পিএস-এপিএস দিয়ে দল পরিচালনা করা হচ্ছে, যা মেনে নেয়া যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, চলতি অর্থবছরে সংসদ সদস্যের বরাদ্দ, কৃষি প্রণোদনা, ঈদের অনুদানসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা একটি ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণ করছে। বিএনপি’র বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের নির্দেশনা মেনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নাছির উদ্দীন চৌধুরীকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ওই সিন্ডিকেটের কারণে সংসদ সদস্য তাদের ধন্যবাদ পর্যন্ত দিতেও পারেননি। মাসুক বলেন, তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ রয়েছে, তবে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।

নাছির উদ্দীন চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগে একটি ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, ওই সিন্ডিকেটের কেউ কেউ অতীতে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন। এ সমাবেশে পৌর বিএনপি’র সদস্য সচিব এডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম, পৌর বিএনপি’র আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, যুগ্ম আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রতি রঞ্জন দাস, জেলা বিএনপি’র সদস্য অশোক রায়, উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল করিম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ই আগস্ট জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও সদস্য (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) এডভোকেট আব্দুল হকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দিরাই উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র আহ্বায়ক এবং যুগ্ম আহ্বায়কদের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শক্রমে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বাধীন অংশ ওই নির্দেশনা অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে মাইনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, ‘এই চিঠি আগেই দুই পক্ষকে দেয়া হয়েছিল, যাতে কেউ আলাদা কর্মসূচি না দেন। কিন্তু তারা তা মানেনি। তাই আমাদের পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচি নির্ধারিত তারিখেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জীব সরকার বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইন মেনে চলার জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তা মানার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন