আইনের শাসন বিচার নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে না

আইনের শাসন বিচার নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে না

ফন্ট সাইজ:

দেশে আইনের শাসন ও বিচার নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। ফ্যাসিবাদ যাতে আর ফিরে আসতে না পারে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য 
করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, কোনো এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

শনিবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত সমাবেশ ও গণসংগীত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মাহমুদুর রহমান মান্না আরও বলেন, আবু সাইদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমরা প্রমাণ করেছেন আমরা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হলেও মাথা নোয়াই না। জুলাইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের শ্রদ্ধা জানাই। যারা চোখ, হাত, পা হারিয়েছেন, যারা পঙ্গু হয়েছেন, তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। কিন্তু জুলাইয়ের স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়েছে? সবাই বলবেন, না। সামনে ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচন। এই নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারবে কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে এটাও বলবো, জুলাইয়ের আন্দোলনের কিছু আশা পূরণ হয়েছে।

মান্না বলেন, এখন দেশে আইনের শাসন ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসতে না পারে। এমন একটা ব্যবস্থা চাই, তখনই হবে যখন ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে। এক ব্যক্তির শাসন কায়েম করা যাবে না। দেশে বিচারহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, জমি দখল হয়ে গেলে মামলা করেও অনেক সময় মানুষ জমি ফেরত পান না। কারণ দখলকারী আগে থেকেই অর্থের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে রাখেন। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মান্না। তিনি বলেন, বেকারত্ব দূর করতে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার বলেছে, এক বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করবে। এখন সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারে কিনা, সেটিই দেখতে হবে। আমরা দেখতে চাই, আমাদের দেশ সেই বদলের দিকে যাচ্ছে কিনা।

বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে কাজীর শাসনের সময় শাসককেও বিচারের আওতায় আনা যেতো এবং জরিমানা করার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিচার বিভাগের সেই ক্ষমতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী যদি সবাইকে নিয়োগ দিতে পারেন, তাহলে প্রয়োজনে তাদের চাকরিও কেড়ে নেয়ার ক্ষমতাও তার হাতে। বিএনপি যদি এই পদ্ধতি থেকে সরে না আসে, তাহলে এর বিরোধিতা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মান্না আরও বলেন, গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বর্তমান সরকার দ্রব্যমূল্য কমাতে পারছে না। এর মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। কে কোথায় দখল নেবে, কে ব্যানার লাগাবে- এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি হচ্ছে। অথচ জনগণের কথা কখন ভাবা হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। দেশে যখন অশান্তি চলবে, বহিঃশক্তির জন্য সুবিধা হবে। আমরা এমন একটি দেশ চাই, যে দেশে আমি শান্তিতে থাকতে পারবো, যে দেশে শান্তিতে মরতে পারবো। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করে মান্না বলেন, দেশে অনেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেন। মধ্যপ্রাচ্যে হামলা হলে তারা আন্দোলন করেন, কিন্তু দেশের মানুষ যখন অনাহারে মারা যায়, তখন তাদের সেই ভূমিকা দেখা যায় না। মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তার বিষয়েও তাদের সোচ্চার হওয়া উচিত।

নাগরিক ঐক্য শুধু সরকারের সমালোচনা করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকদের ঋণ মওকুফের উদ্যোগ ভালো হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ভালো উদ্যোগ। তবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য একটি কার্যকর ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। যারা সবচেয়ে বেশি দরিদ্র, তাদের হকও বেশি হওয়া উচিত। ধনী-গরিব যাচাই না করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হবেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সমাবেশে নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ্‌ কায়সার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসনের পরাজয়ের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের ভূমিকা ছিল। এ আন্দোলন কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। এখন সময় এসেছে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন রাজা, কেন্দ্রীয় সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আব্দুস সালাম, নারী ঐক্যের আহ্বায়ক শাহনাজ রানু, সদস্য সচিব ফেরদৌসী আক্তার, নাগরিক ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ফজলে রাব্বী ও সদস্য সচিব তানভীর ইসলাম স্বাধীন প্রমুখ। সমাবেশ শেষে গণসংগীত পরিবেশন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ, জুলাইয়ের আন্দোলন, মানুষের অধিকার, সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যয় তুলে ধরে বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন