আশ্রয় আবেদন বাতিল হলে কাজের অধিকার হারাতে পারেন হাজারো অভিবাসী

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস

আশ্রয় আবেদন বাতিল হলে কাজের অধিকার হারাতে পারেন হাজারো অভিবাসী

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পথে এগোচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় সুরক্ষা (প্রোটেকশন) ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে অস্থায়ী ভিসাধারীদের কাজের অধিকার বাতিল, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ব্রিজিং ভিসায় থাকার সুযোগ সীমিত করা, আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং অস্থায়ী অভিবাসীদের দ্রুত দেশত্যাগে উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে মন্ত্রিসভা।

তবে এই অভিবাসন সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে সরকারের ভেতরেই মতভেদ দেখা দিয়েছে। ব্যাকপ্যাকার ভিসায় কড়াকড়ি, পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসার নিয়ম কঠোর করা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের কাজ ও আপিলের অধিকার সীমিত করার প্রস্তাব নিয়ে একাধিক দফা আলোচনা হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি মন্ত্রিসভা। এ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে নির্ধারিত ভাষণও শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক চাপও বড় কারণ:

কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিট বৈদেশিক অভিবাসন রেকর্ড ৫ লাখ ৫৮ হাজারে পৌঁছানোর পর থেকেই সরকার বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। সরকারের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে তা কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। ওয়ান নেশন ও বিরোধী জোট দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতির দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও সরকারের দাবি, তারা ব্যাপক অভিবাসন কমানো নয়, বরং ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকেই এগোচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কড়া সমালোচনা:

প্রস্তাবিত পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে 

মানবাধিকার, শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান দেখাতে গিয়ে সরকার যেন উগ্র অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে।

অ্যাসাইলাম সিকার সেন্টার বলেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা এবং দাতব্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। সংগঠনটির মতে, আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে মানুষকে নিজেদের ও পরিবারের ভরণপোষণের সুযোগ দিতে হবে। আর যদি কাজের অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের ভাষ্য, সুরক্ষা ভিসার সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত থাকতে পারে। তাই আপিলের সুযোগ সংকুচিত করার পরিবর্তে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণই হওয়া উচিত।

বাড়ছে ব্রিজিং ভিসাধারীর সংখ্যা:

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক হাজার ৫৮০টি সুরক্ষা ভিসার আবেদন জমা পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবেদন কিছুটা কমলেও আবেদনকারীদের বড় অংশই ছাত্র ও ভিজিটর ভিসায় আসা চীন, ভারত, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের নাগরিক।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব আবেদনের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে আবেদনকারীরা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনাল (ART) এবং ফেডারেল কোর্টে আপিল করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া শেষ হতে আট বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এই সময় আবেদনকারীরা ব্রিজিং ভিসায় থেকে সাধারণত কাজের অনুমতি পান। সরকারের উদ্বেগ, কেউ কেউ এই সুযোগে দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। গত জুন মাস পর্যন্ত ART-এ প্রায় ৩৭ হাজার প্রত্যাখ্যাত সুরক্ষা আবেদন পর্যালোচনাধীন ছিল। এর বেশিরভাগ নিষ্পত্তি হতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগছে।

অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থায় কড়াকড়ির পরিকল্পনা:

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ব্রিজিং ভিসাধারীর সংখ্যা এক লাখ ৩০ হাজার ৪৫০ থেকে বেড়ে চার লাখ ১৩ হাজারে পৌঁছেছে।

একই সময়ে ব্যাকপ্যাকার ভিসাধারীর সংখ্যা এক লাখ ৪৬ হাজার ৩৪০ থেকে বেড়ে দুই লাখ ২৫ হাজার ৬৫০ হয়েছে। শিক্ষার্থী ভিসাধারীর সংখ্যাও বেড়ে তিন লাখ ৮৩ হাজার ৯১০ থেকে পাঁচ লাখ ২৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের মতে, অস্থায়ী ভিসাধারীর এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অভিবাসন সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

অভিবাসন বিরোধী রাজনীতি অনুসরণ না করার আহ্বান:

অ্যাসাইলাম সিকার রিসোর্স সেন্টারের ডেপুটি সিইও জানা ফাভেরো বলেন, টনি বার্কের ভাষণ স্থগিত হওয়ায় সরকার প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ পেয়েছে।

তার মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সীমিত করা উদ্বেগজনক হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা মানুষকে বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করবে। তিনি বলেন, অভিবাসীদের দোষারোপ করে আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বা ভাড়া বৃদ্ধির সমস্যার সমাধান হবে না।

কাজের অধিকার কেড়ে নিলে শোষণ বাড়বে:

রিফিউজি অ্যাডভাইস অ্যান্ড কেসওয়ার্ক সার্ভিসের কেন্দ্র পরিচালক ও প্রধান সলিসিটর সারাহ ডেল বলেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে আশ্রয়প্রার্থীদের জীবনে গুরুতর প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, মানুষের কাজ করার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের দাতব্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা এক ধরনের ইচ্ছাকৃত অপমান। অভিবাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া দরকার, তবে সেটি একই সঙ্গে ন্যায্য ও মানবিক হওয়া উচিত।

কালো অর্থনীতিতে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি:

মানবাধিকার আইন কেন্দ্রের আইন পরিচালক সানমতি ভার্মা বলেন, কাজের অধিকার হারালে আশ্রয়প্রার্থীরা অনিরাপদ ও শোষণমূলক কর্ম পরিবেশে যেতে বাধ্য হতে পারেন। তার মতে, কোনো শ্রমিক গোষ্ঠীর অধিকার কমানো হলে শেষ পর্যন্ত সব শ্রমিকের অবস্থার ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রিফিউজি কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডভোকেসি কোঅর্ডিনেটর ড. গ্রাহাম থম বলেন, মানুষের অধিকার সংকুচিত করে অভিবাসন সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের নীতি হওয়া উচিত মানবিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া, বিভাজনমূলক রাজনীতির ভিত্তিতে নয়।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা:

প্রস্তাবিত সংস্কার নিয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে অভিবাসন কমানোর রাজনৈতিক চাপ, বাড়তে থাকা অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা এবং আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা বিবেচনায় নিলে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে শিগগিরই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে হাজারো অস্থায়ী ভিসাধারী ও আশ্রয়প্রার্থীর জীবনে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন