দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার শেষ রাজনৈতিক জুয়া

দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার শেষ রাজনৈতিক জুয়া

ফন্ট সাইজ:

পোকার খেলায় যেমন নিজের হাতে থাকা তাস অন্যকে দেখানো হয় না, তেমনি রাজনীতিতেও নিজের পরিকল্পনা আগেভাগে প্রকাশ করা হয় না। এ কারণেই বুধবার (৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পেছনের কারণটি বোঝা কঠিন।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়, দেশে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতাদের কেউ বিদেশে, কেউ কারাগারে, আবার কেউ আত্মগোপনে- এরপরেও যদি সত্যিই শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান তাহলে তিনি কি বারবার প্রকাশ্যে দেশে ফেরার কথা বলতেন?

হাসিনার দেশে ফেরা, যদি তা সত্যিই ঘটে, তাহলে ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হবে নিঃসন্দেহে। ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার সরকারের পতন ঘটে এবং তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।

তাহলে এমন একটি ঘটনার আকস্মিকতা কেন নষ্ট করা হচ্ছে? বারবার দেশে ফেরার কথা বলে বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতিতে সম্ভাব্য সেই ঘটনার প্রভাবই বা কেন ভোঁতা করা হচ্ছে?
হাসিনা কি কেবল পরিস্থিতি যাচাই করছেন, নাকি বাংলাদেশে তার জন্য এমন একটি রাজনৈতিক জায়গা খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যে রাজনীতি যেন তাকে ছাড়াই এগিয়ে গেছে?

একই বক্তব্য, বারবার

গত বছরের ৭ জুন শেখ হাসিনা আমার সঙ্গে এবং আমার সহলেখকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আমরা আমাদের বই ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভল্যুশন’- এর জন্য আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মাধ্যমে সাবেক বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুরোধ জানিয়েছিলাম।
তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, এটি কোনো সাক্ষাৎকার নয়; বরং একটি আলাপচারিতা। তবে ওই কথোপকথনের বিষয়বস্তু বইয়ে ব্যবহার করা যাবে বলে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা তখন আমাদের এমন একটি তথ্য জানিয়েছিলেন, যা অনেকটা এক্সক্লুসিভ খবরের মতোই ছিল। আমাদের এই কথোপকথনের সময় মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে ছিলেন।
তখনও হাসিনা দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। এরপর থেকে ভারতীয় ও বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন হাসিনা।
এরপর বুধবার নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য গণমাধ্যমে উপস্থিতি, যদিও তিনি সেখানে শুধু অডিওর মাধ্যমে অংশ নেন। তবে দেশে ফেরার তথ্য ছাড়া বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে হাসিনার বলার মতো নতুন কিছু ছিল না।
গত কয়েক মাসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফেসবুক লাইভে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকে ই-মেইল ও টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি একই অবস্থান জানিয়ে আসছেন।
বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেন। তিনিও আগের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় 'ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ' বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল বক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েও ওয়াজেদ একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন।
সজীব ওয়াজেদের ওই বক্তব্য কলকাতা ও ঢাকায় খবরের শিরোনাম হয়েছিল। একইভাবে হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে করা প্রতিটি মন্তব্যও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা এখন হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে বরং হালকাভাবে, এমনকি ঠাট্টা-রসিকতার সঙ্গেও নিতে শুরু করেছেন। হাসিনা ও তার দলের জন্য এটি নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া নয়।
বুধবার এক পডকাস্টে নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল বলেন, হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন না- এ বিষয়ে তিনি এক লাখ টাকা বাজি ধরতে প্রস্তুত।
পডকাস্টটির লিংক ফেসবুকে শেয়ার করে বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোবাশ্বর হাসান লেখেন, তিনি খলিলের বাজির সঙ্গে আরও এক লাখ টাকা যোগ করবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজপথে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত ছাত্রনেতা সাদিক কায়েম হাসিনার প্রতীকী ফাঁসির মিছিল বের করেন। এ সময় জনতা উল্লাস করে।
এদিকে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনাকে ‘পলাতক দণ্ডিত গণহত্যাকারী’ আখ্যা দিয়ে একটি বিবৃতি দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানোর পরও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেয়ায় ঢাকা গভীরভাবে দুঃখিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হাসিনাকে এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম দেয়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে “সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নের জন্যও ক্ষতিকর।”
সাংবাদিক নাজমুল আহসান বলেন, কোনো বিদেশি দেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তিনি এর আগে এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখেছেন বলে তার মনে পড়ে না।
এক্সে তিনি লিখেন, শেখ হাসিনার উপস্থিতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের আশা আরও ম্লান করে দিয়েছে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরও হঠাৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
তাহলে গত বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা কী অর্জন করলেন?

হাসিনা কি সত্যিই ফিরবেন?

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি দ্য প্রিন্ট’কে বলেন, ডিসেম্বর মাসে হাসিনার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার “শেষ জুয়া” হতে পারে, তবে এটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
তার ভাষায়, তিনি হয়তো দেশের পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছেন এবং দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারেক রহমানের সরকারও ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের চেয়ে ভালো নয়। বাংলাদেশিরা যা ঘটছে তাতে বিরক্ত। আর গণমাধ্যম নতুন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশের মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তবে বিদেশে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য প্রিন্ট’কে বলেন, হাসিনার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন তাকে বোঝাচ্ছেন যে তিনি বাংলাদেশে ফিরলে তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এমন নাও হতে পারে।
ওই নেতা বলেন, আমাদের নেত্রী অস্থির হয়ে উঠেছেন। তিনি প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে আছেন। আওয়ামী লীগকে ছাড়াই দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। এখন একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। আর আমাদের দলের সদস্যরা হয় কারাগারে, নয়তো ফেসবুকে ১৯৭১ সালের মতো বিপ্লবের ডাক দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, কঠিন সত্য হলো, নেত্রীর দেশে ফেরার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা কেবল পরিস্থিতি যাচাই করছি। হাসিনা যেদিনই দেশে ফিরুন না কেন, তার প্রত্যাবর্তন শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে তার রাজনৈতিক দল ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে এই প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনা করা উচিত। এটিকে কোনো রাজনৈতিক কৌশল বা লোক দেখানো পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য এটিই হয়তো শেখ হাসিনার শেষ রাজনৈতিক জুয়া।
দীপ হালদার একজন লেখক এবং দ্য প্রিন্ট-এর সহযোগী সম্পাদক

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন