ন্যাটোভুক্ত দেশে হামলার ছক পুতিনের, নেপথ্যে কী?

ন্যাটোভুক্ত দেশে হামলার ছক পুতিনের, নেপথ্যে কী?

ফন্ট সাইজ:

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর যেকোনো একটিতে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া। জোটভুক্ত এসব দেশের সংকল্প ও ঐক্য পরীক্ষা করতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সীমিত আকারে হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারেন। সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে রাশিয়ার সম্ভাব্য উত্তেজনা বৃদ্ধির কয়েকটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে সীমিত পরিসরের সামরিক অনুপ্রবেশও রয়েছে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হতে পারে ন্যাটোর ঐক্য ও ‘আর্টিকেল ৫’-এর প্রতি সদস্যদেশগুলোর অঙ্গীকার পরীক্ষা করা।

ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, জোটের একটি সদস্যের ওপর হামলা সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে রাশিয়া এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে তা ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার সীমা অতিক্রম না করে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পুতিন কীভাবে বা কখন এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি সূত্রের মতে, তিনি সম্ভবত কোনোভাবে উত্তেজনা বাড়াতে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো অথবা পোল্যান্ডকে লক্ষ্য করতে পারেন। সাম্প্রতিক এই গোয়েন্দা মূল্যায়নের খবর প্রথম প্রকাশ করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা মনে করছেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার কোনো পথ পুতিন যদি না পান, তাহলে তিনি ন্যাটোর বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পুতিনের পরবর্তী পদক্ষেপ বেছে নেয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা এখন থেকে আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত বিস্তৃত।
ন্যাটোর জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র মার্টিন ও’ডনেল গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ন্যাটো ‘সব সময় বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করছে এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে’।

তিনি আরও বলেন, ন্যাটো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য আমরা প্রস্তুত- যা আমরা অব্যাহতভাবে প্রমাণ করে চলেছি।
গত কয়েক বছরে রাশিয়ার ন্যাটোর ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে গত মে মাসে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের কাছাকাছি একটি বন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালানোর সময় বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন রোমানিয়ার একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এতে দুজন আহত হয়েছেন।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরেও ইউক্রেনে রুশ হামলার সময় একাধিক রুশ ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান সেগুলো ভূপাতিত করে।
এ ছাড়া জার্মানির একটি বিমানবন্দরে গত বুধবার রাতে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়া যায়। ইউরোপে অবস্থানরত এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন অনুযায়ী ড্রোনটি রাশিয়ার একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছিল। ওই কর্মকর্তা জানান, ড্রোনটিতে সামরিক কাজে ব্যবহৃত বিস্ফোরক ছিল।

এনিয়ে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ট বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ড্রোন দেখা যাওয়া, ড্রোনের হুমকি হাইব্রিড- এমন বিষয়, যা আমরা অতীতে দেখেছি। তবে বিস্ফোরকসজ্জিত একটি ড্রোন বিমানবন্দরে পাওয়া যাওয়া একটি নতুন ধরনের হুমকির পরিস্থিতি।

বৃহস্পতিবার ডোব্রিন্ট ইঙ্গিত দেন, ড্রোনটির সঙ্গে ‘বিদেশি শক্তির’ সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পরবর্তীতে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের নেতৃত্বাধীন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ শুক্রবার বৈঠক করে বিমানবন্দরের ওই ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
রাশিয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং রুশ দূরপাল্লার অস্ত্রের হামলায় ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সিএনএন এর আগে তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাডের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার হয়ে গেছে। একইভাবে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক ইন্টারসেপ্টরও ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাশিয়ার দূরপাল্লার অস্ত্রের হামলায় ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি সপ্তাহে এক রাতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইউক্রেনে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই হামলায় ছোড়া কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করতে পারেনি।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ব্যবস্থার মজুত নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনায়ও প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে পুতিনের ন্যাটোর বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ানোর সম্ভাবনা কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধও রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যক্তিগতভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ছয়টি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও ট্রাম্প এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ‘গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র’ রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ার সময়েই নতুন এই মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন সামনে এলো।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চলমান নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে এসব পদক্ষেপ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের সামরিক অভিযান থামাতে পারেনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন