পরিচয়ের রাজনীতি, ভূরাজনীতির দাবার বোর্ড

পার্বত্য চট্টগ্রাম

পরিচয়ের রাজনীতি, ভূরাজনীতির দাবার বোর্ড

ফন্ট সাইজ:

৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বাংলাদেশে একটি পুরোনো বিতর্ক নতুন করে ফিরে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নেটওয়ার্ক, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং একাডেমিক আলোচনায় তর্ক-বিতর্কের আবহে উচ্চারিত হয়—"আদিবাসী", “উপজাতি“, “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠ“, "সেটেলার", "স্বদেশ", "অধিকার"—ইত্যাদি শব্দ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিচিতির বিতর্ক কি সত্যিই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গবেষণার আলোকে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে পার্বত্য সংঘাতময় চট্টগ্রামকে অধিকতর-সংঘাতের একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দাবার বোর্ড হিসেবে পুনর্নির্মাণ করছে?

নানা কারণে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেবল একটি জাতিগত প্রশ্ন হিসেবে দেখা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই অঞ্চলের পাশেই এখন রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের অস্থিরতা, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, করিডোর রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কূটনীতির সংযোগস্থল। ফলে পরিচয়ের প্রশ্নও আর নিছক সাংস্কৃতিক নয়। ক্রমশ জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অংশে পরিণত হয়েছে। আর এখানেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
চ্যালেঞ্জের একটি দিক হলো, ইতিহাসকে কি রাজনীতির ভাষায় লেখা যায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সামাজিক বিন্যাস দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিবাসন, সীমান্ত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের ফল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খুমি, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে আরাকান, চিন পাহাড়, ত্রিপুরা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসে বসতি স্থাপন করেছে—এমন তথ্য বহু ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। এ বাস্তবতা কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে খাটো করে না। কিন্তু এটি দেখায় যে ইতিহাসকে সরলীকরণ করা যায় না। আর এ কারণেই "আদিবাসী" প্রশ্নটি বাংলাদেশে কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক দাবির বিষয় নয়: ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনার বিষয়।
আরেকটি সমস্যা হলো এই যে, জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাও (UNDRIP) "Indigenous Peoples" বা “আদিবাসী“-এর একটি সর্বজনস্বীকৃত বাধ্যতামূলক সংজ্ঞা দেয়নি। বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব ইতিহাস ও সাংবিধানিক বাস্তবতার আলোকে এ প্রশ্ন নির্ধারণ করে। যেমন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে "উপজাতি", "ক্ষুদ্র জাতিসত্তা", "নৃগোষ্ঠী" ও "সম্প্রদায়" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে; "আদিবাসী" শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। তাছাড়া, ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ্য করা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রশাসনিক দলিল, বিশেষ করে Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900, পাকিস্তান আমলের সরকারি নথিপত্র কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের আইন ও প্রশাসনিক দলিলসমূহে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে "আদিবাসী" (Indigenous) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি। একইভাবে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতেও "আদিবাসী" শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার, আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি কমিশন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পেলেও "Indigenous Peoples" ই “আদবিাসী“ পরিচয়ের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। অতএব, “আদিবাসী“ পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা গবেষণার চেয়ে রাজনীতির কাছাকাছি চলে যায়।
একইভাবে, "সেটেলার" শব্দটি রাজনৈতিক ভাষায় সামাজিক বিভাজন ঘটাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পটভূমিতে সমানভাবে উদ্বেগজনক আরেকটি প্রবণতা হলো পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের "সেটেলার"/"Settler" হিসেবে চিহ্নিত করা। আন্তর্জাতিক আইনে "Settler Colonialism" ধারণাটি সাধারণত এমন পরিস্থিতির জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বিদেশি জনগোষ্ঠী এনে স্থানীয় জনগণকে প্রতিস্থাপন করে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই ধারণাকে সরাসরি প্রয়োগ করা ইতিহাস ও আইন—উভয় দিক থেকেই প্রশ্নসাপেক্ষ।
কারণ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিরা বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাদের "সেটেলার" হিসেবে অভিহিত করা কেবল একটি শব্দচয়ন নয়; এটি নাগরিকত্বের ধারণাকে বিভক্ত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। যখন বলা হয় পাহাড় কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মানুষের "স্বদেশ" এবং অন্যরা "সেটেলার", তখন একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধারণা তৈরি হয়—যেন বাংলাদেশের ভেতরেই দুটি পৃথক নাগরিকত্ব বিদ্যমান। এই ধরনের ভাষা শেষ পর্যন্ত সামাজিক আস্থা দুর্বল করে, সাংবিধানিক সমতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বিভাজনমূলক রাজনীতিকে উৎসাহিত করে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিচয়ের রাজনীতি ক্রমশ জটিল ভূরাজনীতির দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো কেবল পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, ভূরাজনীতির ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা সংকট, চীনের আঞ্চলিক কৌশল, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কূটনীতির সংযোগে এই অঞ্চল নতুন কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করেছে। ফলে জাতিগত প্রশ্নও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অংশে পরিণত হচ্ছে। যেখানে জাতিগত পরিচয় কেবল সাংস্কৃতিক বাস্তবতা নয়। বরং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা, তথ্যযুদ্ধ এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অবকাঠামোতেও রূপান্তরিত হতে পারে।
তাছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভ্রান্ত বিতর্ক চালু রয়েছে। কেউ বলেন, উন্নয়ন হলেই নিরাপত্তা আসবে। আবার কেউ মনে করেন, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু দুটি ধারণাই অসম্পূর্ণ। বাস্তবে নিরাপত্তাহীন উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার উন্নয়নহীন নিরাপত্তাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামে Security–Development Nexus-এর বিকল্প নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, ভূমি প্রশাসন, আইনের শাসন এবং সীমান্ত নিরাপত্তাকে একসঙ্গে অগ্রসর করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে তথ্যযুদ্ধের নতুন বাস্তবতাও পাড়ি দিতে হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে যুদ্ধের চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে গেছে। এখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ সবসময় সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ, গোলাবর্ষণ কিংবা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। বরং সমান্তরালভাবে পরিচালিত হয় তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare), বর্ণনার রাজনীতি (Politics of Narrative), জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিযোগিতা (Knowledge Competition) এবং আন্তর্জাতিক জনমত নির্মাণের (Global Opinion Shaping) মাধ্যমে। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটিকে কখনো cognitive warfare, কখনো narrative warfare, আবার কখনো discursive power বলা হয়। অর্থাৎ, যে পক্ষ ঘটনাকে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিসরে তার অবস্থানই অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়: একই সঙ্গে একটি তথ্যগত ও বর্ণনাগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে ধারণা, প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়, তার একটি বড় অংশই তৈরি হয় বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা, দাতা সংস্থা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এদের অনেক গবেষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করলেও একই সঙ্গে এটিও সত্য যে গবেষণা কখনোই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার বাইরে অবস্থান করে না। প্রতিটি গবেষণা নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো, অর্থায়নের উৎস, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়। ফলে অনেক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা নিরাপত্তা, সীমান্ত রাজনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, স্থানীয় সমাজ-অর্থনীতি কিংবা বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল মানবাধিকার বা পরিচয় রাজনীতির একমাত্রিক বয়ানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সমস্যা হলো, বাংলাদেশ এখনো নিজের বর্ণনা নিজে নির্মাণে যথেষ্ট সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের তথ্যভাণ্ডার, আর্কাইভ, নীতিনির্ভর প্রকাশনা, একাডেমিক জার্নাল, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং গবেষণাভিত্তিক জনকূটনীতিতে (academic diplomacy) যে বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক সময় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। অন্যেরা যে প্রশ্ন তোলে, বাংলাদেশকে তার জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হতে হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো "Narrative Power"—অর্থাৎ যে রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী নিজের ইতিহাস, সংকট ও নীতির গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে কেবল জনমতই নয়, নীতিনির্ধারণেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। জোসেফ নাই যেভাবে "Soft Power"-এর কথা বলেছেন, আজকের বিশ্বে তথ্য, গবেষণা ও বর্ণনা সেই সফট পাওয়ারের অন্যতম প্রধান উপাদান। অন্যদিকে মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা (knowledge and power) একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। যে জ্ঞান প্রভাবশালী হয়, শেষ পর্যন্ত সেই জ্ঞানই রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে আন্তর্জাতিকভাবে কোন বয়ান প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটি কেবল একাডেমিক প্রশ্ন নয়: ভবিষ্যতের কূটনীতি, উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবাধিকার আলোচনাসহ নিরাপত্তা নীতিতেও প্রভাব বিস্তারী বিষয়।
এই কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে তথ্যযুদ্ধকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। যদি বাংলাদেশের গবেষণা দুর্বল হয়, যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তথ্যপ্রকাশ সীমিত থাকে, যদি দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ না করে, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যের নির্মিত বয়ানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি পুরোনো বাস্তবতা হলো—যে রাষ্ট্র নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না, তার গল্প অন্যরা লিখে দেয়। আর অন্যেরা যখন সেই গল্প লেখে, তখন সেখানে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অগ্রাধিকার ও স্বার্থও প্রতিফলিত হয়।
অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ শুধু উন্নয়ন প্রকল্প, শান্তিচুক্তি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে না; সমানভাবে নির্ভর করবে জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা, গবেষণাভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি, ডিজিটাল তথ্যকূটনীতি, আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্পৃক্ততা এবং তথ্য-নির্ভর কৌশলগত যোগাযোগের ওপর। বাংলাদেশের উচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি সমন্বিত National Knowledge and Strategic Communication Initiative গড়ে তোলা, যেখানে দেশীয় গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, নীতিনির্ধারক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকেরা যৌথভাবে কাজ করবেন। কারণ বর্তমান বিশ্বে সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বর্ণনাও রক্ষা করতে হয়; আর তথ্যযুদ্ধে পরাজিত রাষ্ট্র অনেক সময় সামরিকভাবে নয়, ধারণাগতভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের সামনে আরেক বড় প্রয়োজন একটি Inclusive National Integration Framework—যার ভিত্তি হবে সাংবিধানিক সমঅধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় শাসন। একই সঙ্গে শান্তিচুক্তির অর্জন ও সীমাবদ্ধতার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন, পরিচয় প্রশ্নে গবেষণাভিত্তিক জাতীয় সংলাপ, আন্তর্জাতিক মানের তথ্য উৎপাদন এবং পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক আস্থা পুনর্গঠন অপরিহার্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কোনো একটি পরিচয়ের জয়ে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রদর্শনের সফলতায় নিহিত। যদি "আদিবাসী" এবং "সেটেলার"—উভয় পরিভাষাই রাজনৈতিক মেরুকরণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে শুধু একটি অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংহতি, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। তাই, রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ—তার ভাষা, সংস্কৃতি বা পরিচয় যাই হোক না কেন—সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত এবং অন্তর্ভুক্ত বোধ করবে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়: বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। তা যেন কোনো ভাবেই পরিচয়ের রাজনীতির সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার কারণে ভূরাজনীতির দাবার বোর্ডে পরিণত না হয়।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন