একটি ভিডিও ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সিলেট থেকে দ্রুত গতিতে যাচ্ছে ইউনিক পরিবহনের বাস। সামনের দিক থেকে আসছে বেঙ্গল পরিবহনের আরেকটি বাস। হঠাৎ দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ। পাশ দিয়ে নেমে গেল ইউনিক। বেঙ্গল দাঁড়ালো সড়কের উপর। বিকট শব্দের পর মুহূর্তে নিস্তব্ধ চারিদিক। একটু পর চিৎকার। ‘বাঁচাও বাঁচাও’। ভয়ানক দৃশ্য। বাসের জানালায় লাশ ঝুলছে। রক্তের স্রোত বইছে। আহতদের কারও মাথা, মুখ, শরীর বেয়ে রক্ত ঝরছে। ঘটনাটি ঘটেছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের খাসিকাপন এলাকায়। দুর্ঘটনার এমন চিত্র দেখে আঁতকে ওঠেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় উদ্ধারকারী এক যুবক মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আমরা ঘুমে ছিলাম। মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙে। এসে দেখি লাশের সারি। কারও চোখ নেই, মাথা ফাটা। অঝোরে রক্ত ঝরছে। এরই মধ্যে পুলিশও আসে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন- ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চন্ডিপুল থেকে গোয়ালাবাজার পর্যন্ত সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর ওই এলাকায় দু’একটি দুর্ঘটনা হয়। গতকালের দুর্ঘটনা ছিল ভয়াবহ। সকাল তখন ৭টা। সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসটি ছিল দ্রুতগামী। আবার সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসটিও খুব দ্রুত আসছিল। খাসিকাপন এলাকায় ওভারটেক করতে গিয়ে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এমন সময় ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের নিচে জমিতে পড়ে যায়। দুটি বাসের যাত্রীরাই হতাহত হন। কারও কারও লাশ জানালায় ঝুলছিল। রক্ত ঝরছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ। সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তারা এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেন। আহতদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওসমানীনগর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা নিজেই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। জানিয়েছেন- ইউনিকের বাসের ভেতর থেকে একেক করে লাশ বের করা হয়।
মোট ৮টি লাশ উদ্ধার করা হয় বাসের ভেতর থেকে। তিনি বলেন- ঘটনার পর উদ্ধারকৃত লাশগুলোও ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে সকাল ৮টার মধ্যে আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। সকালেই প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কয়েকজন চলে গেছেন। তবে গুরুতর আহত হওয়া এক শিশুকন্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। দুপুরে হাসপাতালের আহতদের দেখতে আসেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির। তিনি জানিয়েছেন- হাসপাতালে আনার পর এক শিশু মারা গেছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল। বাকি আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে একজনকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। ৫ জনের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন- হাসপাতালের ক্যাজুয়েলিটি বিভাগে চারজন ভর্তি ছিলেন।
তাদের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চারজন ভর্তি রয়েছেন। তাদের সর্বশেষ অবস্থা জানতে সিটিস্ক্যান করা হয়েছে। এদিকে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৯ জনের মধ্যে ৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন- সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রিয়ম (২২), দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকার জাহাঙ্গীরের মেয়ে জায়ফা (৪) ও কিশোরগঞ্জের চন্ডিবের এলাকার বাবুল মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী পেহেলি ভৈরবী, কিশোরগঞ্জের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজী সাইফুল ইসলাম (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়া বগডহর এলাকার মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪)। অন্যদের পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনায় আহত হয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ জন।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন- ওয়াব (৪৫), মনসুর (৩৪), আতিকুল ইসলাম (৪৮), বাবুল (৪০), মফিজ মিয়া (৫৫), সাজিদ নুর (৪৫), নুরুন্নাহার (৪০), মুক্তার হোসেন (৬৫), জাহাঙ্গীর (২৮), আফজল (৩০), আফরোজা (৩৮), মন্টু (৩০), রাজু (৫৫)। সিলেটে ঘুরতে এসে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সাইফুল ইসলাম (৫৫) নিহত হয়েছেন। একই দুর্ঘটনায় ওই উপজেলার ফারুকুল ইসলাম ও আব্দুল লতিফ আহত হয়েছেন।
বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসে প্রাণ গেল সাইফুলের: বন্ধুদের নিয়ে সিলেট ঘুরতে এসে এ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সাইফুল ইসলাম। তার বন্ধুরা ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি। জানালেন- বুধবার সাইফুল ইসলাম, ফারুকুল ইসলাম, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আব্দুল লতিফ এই পাঁচ বন্ধু সিলেট ভ্রমণে এসেছিলেন।
ফেরার পথে তাদের মধ্যে সাইফুল, ফারুকুল ও লতিফ বাসে করে কুলিয়ারচরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আর জমরুত মিয়া ও রানা বিমানে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাসটি। আহত আব্দুল লতিফ জানান- শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সিলেট থেকে রওনা দেয়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওসমানীনগর এলাকায় বিপরীতমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওদিকে জমরুত মিয়া বলেন- অনেক দিন ধরেই তাদের সিলেট ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল। বিমানে ওঠার আগেই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি জানান, সংঘর্ষে বাসের এক পাশের যাত্রীরাই বেশি হতাহত হয়েছেন।
নিহত সাইফুল ইসলাম এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন। পেশায় ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন।
বাউলশিল্পী ভৈরবীও মারা গেলেন: নিহতদের মধ্যে একজন বাউলশিল্পী পেহেলি ভৈরবী। বাড়ি ভৈরবে। তিনি বৃহস্পতিবার বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা এলাকায় গান পরিবেশন করতে এসে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনায় তার পিতা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। গান গেয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা উঠতি এই বাউলশিল্পীর আকস্মিক মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ভক্ত-অনুরাগীরাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি তাৎক্ষণিক সরকারের পক্ষ থেকে নিহত ৪ জনের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে ৮০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন। ইউএনও জানান- নিহতদের লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া ও দাফনের ব্যয়সহ নানা কাজে ব্যবহারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এ সহযোগিতা দেয়।
