কাকডাকা ভোর। ফজরের আজান দুই-একটি মসজিদ থেকে ভেসে আসছে। তখনো অন্ধকার। ঠিক এমন সময় প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে জড়ো হন বাজারে, নিজেদের শ্রম বিক্রি করার জন্য। বগুড়ার এরুলিয়া সিলকিবান্দা এলাকায় তারা জড়ো হয়েছিলেন। একটা শ্রমিকের হাট। হঠাৎ এক বিকট শব্দ। কাঁপিয়ে দিলো চারপাশ। মুহূর্তেই সব শেষ। একটি ঘাতক বাস ধেয়ে এলো কাল হয়ে। চালক এক মোটরসাইকেল চালককে বাঁচাতে গিয়ে পিষে দিলো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একঝাঁক মানুষকে। পিষে দিলো সাতটি প্রাণ, সাতটি সংসারের সব আশা। মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো তাজা রক্ত। বাতাসে ভেসে এলো আর্তনাদ। ঘটনাস্থলেই ধুলোয় মিশে গেলেন তিনজন। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে হাসপাতালে নেয়া হলো আরও অনেককে। সেখানে নিভে গেল আরও চার প্রদীপের আলো।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোর ভারী হয়ে উঠলো কান্না আর হাহাকারে। যারা ভোরে ঘর ছেড়েছিলেন কাজ করতে, দুপুরে তারা ঘরে ফিরলেন লাশ হয়ে। শুক্রবার ভোর ৫টার ঘটনা। বগুড়ার এরুলিয়া সিলকিবান্দা এলাকার শ্রমিকের হাটে কাজের জন্য অপেক্ষা করা শ্রমিকদের চাপা দেয় শাহ ফতেহ আলী বাস। সেখানে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩ জন আর শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান আরও ৪ জন। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরও ১৫ জন শ্রমিক। নিহত শ্রমিকরা হলেন- গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বহিলগ্রামের ফয়জার রহমানের ছেলে নূর আলম (৪৫), একই উপজেলার এনায়েতপুরের মৃত আবু সিদ্দিকের পুত্র আবু সাঈদ (৪৫), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার দুঘোলগাছী গ্রামের মৃত গোলাপ শাহ’র পুত্র তাজিমুল (৪৭), বগুড়া সদরের ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার মৃত ইব্রাহীম আলীর পুত্র বেল্লাল হোসেন (৫০), বগুড়ার কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার মৃত নজের হোসেনের পুত্র নূর মোহাম্মদ (৭৬), জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের মৃত খায়বর আলীর পুত্র আনারুল (৫৫) এবং একই জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আমিরপুর এলাকার জালাল উদ্দিনের পুত্র আমিরুল (৪০)। স্থানীয় বাসিন্দা আবু হুরায়রা ও মোহাম্মাদ মিনু জানান, বর্তমানে ধান রোপণের মৌসুম চলছে। এসব শ্রমিক বগুড়ার বাইরে থেকে এসে প্রতি বছর এই সময় এখানে ধান রোপণের কাজ করে।
ভোর থেকে শুরু হয় এখানকার শ্রমিক বাজার। যাদের কাজের লোকের দরকার হয় তারা এই হাটে এসে এসব শ্রমিকদের মজুরির বিনিময়ে কাজের জন্য নিয়ে যান। শুক্রবার ভোরে নওগাঁ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী শাহ ফতেহ আলী নামের একটি বাস এসব শ্রমিকদের চাপা দেয়। একটি মোটরসাইকেল চালককে বাঁচাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে জানান তারা। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম হোসেন জানান, রাতে ঢাকা থেকে নওগাঁর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সকালে এরুলিয়া এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এ সময় সড়কের পাশে অবস্থানরত দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর বাসটি উঠে যায়। এদিকে, দুর্ঘটনার পর প্রায় ৬ ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।
বাজার এলাকায় স্পিড ব্রেকার নির্মাণের দাবি তুলে তরুণরা যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরে সড়ক বিভাগ থেকে স্পিড ব্রেকার নির্মাণকাজ শুরু করলে পুলিশ এবং স্থানীয় গণ্যমান্যদের সহযোগিতায় বেলা ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অপরদিকে, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টায় একই এলাকা এরুলিয়া বিমানবন্দরের সামনে পৃথক আরেক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- বগুড়া সদরের আটাপাড়া এলাকার বাবুল হাসান (৫০) এবং তার স্ত্রী জেসমিন বিবি। নিহত বাবুল হোসেন পেশায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ ইব্রাহীম আলী বলেন, প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ওই দুইজন নিহত হন।
