রাজধানীর বারিধারায় পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে বর্তমানে গুলশানের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাঈমা ইমরান। আর এই আগুন ঘিরে তোলপাড় চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরু হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা সমালোচনা। মুখ খুলছেন না খোদ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।
বৃহস্পতিবার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে গুলশান নর্থ এভিনিউয়ের ৭১ নং রোডে (বীরবিক্রম আমীন আহম্মদ চৌধুরী সড়ক) অবস্থিত বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়া হয়। বারিধারা ফায়ার স্টেশনের দু’টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
বারিধারা ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার সজীব বলেন, আমরা তো প্রথমে গিয়ে অবাক হয়েছি, এতটুকু আগুনে এত ধোঁয়া কীভাবে তৈরি হলো? তিনি বলেন, মূলত: হাইকমিশনার যেই রুমে ঘুমান সেই রুমের পাশের রুমে আগুন লাগে। পাশাপাশি দুটো রুম। একটা বেডরুম। আরেকটা বসার বা ড্রয়িংরুম হবে হয়তো। সেখানে বড় একটা টিভি ছিল, একটা এসি ছিল, আরও অনান্য আসবাবপত্র ছিল। আগুনটা ওই বসার রুমেই লাগে।
ওই রুমের জানালা ছিল কিন্তু আমরা গিয়ে তা বন্ধ পাই। এমন একটা পরিস্থিতি ছিল রুমের ভেতর যে, আমরাও নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমাদের বিশেষ গ্যাস ব্যবহারের পরে একটু শ্বাস নিতে পারি। তারপর আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করি। তিনি বলেন, আগুন বেশি বড় ছিল না। বালতি আর মগের পানি দিয়েই নেভানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রুমের ভেতরে ধোঁয়া ছিল অনেক। পরে আমাদের মেশিন দিয়ে সব ধোঁয়া বের করে দিই। জানালা খুলে ভেনটিলেশনের ব্যবস্থা করি। তিনি বলেন, যখন আগুন লাগে তখন বাসার ভেতর হাইকমিশনার ও তার স্ত্রী দু’জনেই ছিলেন। তাদের কোনো সন্তান বা ছেলে-মেয়েকে আমরা দেখিনি। এদিকে পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসভবনে আগুন লাগার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সেখানে অনেকেই বলেছেন, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। শুধু দূতাবাস নয়, পুরো কূটনৈতিক পাড়ায় এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেখানে আগুন লাগে কী করে? কেউ আবার লিখছেন- কোনো নারীঘটিত কাণ্ড জেনে ফেলায় স্ত্রী নিজের গায়ে আগুন দেয়ার চেষ্টা করেন। সেই থেকেই আগুনের সূত্রপাত। কেউ আবার বলছেন, প্রোটোকল অনুযায়ী কোনো দূতাবাসে আগুন লাগলে বা কোনো রাষ্ট্রদূত বিপদের সম্মুখীন হলে বা হাসপতালে ভর্তি হতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হয়। কিন্তু ভোররাত ৪টায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রায় ৫ ঘণ্টা পরে হাসপাতালে ভর্তি হলেও মন্ত্রণালয়কে জানায়নি পাকিস্তানি দূতাবাস। এমনকি দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়নি।
তাহলে কি এই আগুনের পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে?
গতকাল সরজমিন পাকিস্তান হাইকমিশনে গিয়ে দেখা যায়, দূতাবাসটির চারপাশেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। হাইকমিশনে যাওয়ার আগেই গুলশান নর্থ এভিনিউয়ের মূল সড়কের মাঝে বসানো হয়েছে পুলিশ চেকপোস্ট। ওই রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতেই পাকিস্তান দূতাবাসের প্রধান গেটের সামনের ৭১ নম্বর মূল রাস্তার পাশে রয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দূতাবাসের মূল গেটের ডান পাশে নিরাপত্তাকর্মীর কক্ষে অবস্থান করছেন পুলিশ সদস্যরা। প্রধান গেটের বাম পাশে ভেতরে প্রবেশের পকেট গেটের মধ্যে রয়েছেন দূতাবাসের নিজস্ব কর্মীরা। আর দূতাবাসের পেছনের দিকে থাকা আরেকটি গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে আছেন এপিবিএন’র সদস্যরা। তবে দূতাবাসে ঢোকার পকেট গেটে দায়িত্বরত উর্দুভাষী পাকিস্তানি নিরাপত্তাকর্মী বলেন, বর্তমানে হাইকমিশনার ও তার স্ত্রী দু’জনেই ভালো আছেন। তারা এখনো বাসায় ফেরেননি। তারা দু’জনই হাসপতালে ভর্তি। তবে আগুন ঠিক কীভাবে লেগেছে, সে সম্পর্কে কিছু বলতে নারাজ তারা। উর্দু ভাষায় তারা বলেন, আমরা গেটে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ভেতরে কি হয়েছে সে সম্পর্কে আমরা জানি না। এতটুকু বলতে পারবো- তারা দু’জনই ভালো আছেন। এছাড়া এ বিষয়ে আমরা তেমন কিছুই বলতে পারবো না। এমনকি তারা নিজেদের নাম বলতেও রাজি হননি।
পাকিস্তানি হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাঈমা ইমরান যেই হাসপতালে ভর্তি সেই হাসপাতলে গিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার স্ত্রী নাঈমাকে কেবিনে রেখে চিকিৎসা দিলেও বর্তমানে তাদের দু’জনকেই হাসপাতালটির দ্বিতীয়তলার আইসিইউতে ভতি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। হাসপতালটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মুরাদ হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে হাসপাতলে নিয়ে আসা হয় পাকিস্তানি হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাঈমা ইমরানকে। তাদের শরীরে কোনো বার্ন বা ক্ষত নেই। তবে ধোঁয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এজন্যই তাদেরকে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপতালটির আইসিইউ’র সামনে গেলে দেখা যায়, সেখানে ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাঈমা ইমরানের চিকিৎসার তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত রয়েছেন পাকিস্তানি দূতাবাসের নিজস্ব কর্তা ব্যক্তিরা। আইসিইউ’র সামনের কাউন্সিলিং রুমে ও বাইরে দাঁড়িয়ে তারা সব খবরাখবর নিচ্ছেন। নিজেদের নাম প্রকাশে রাজি না হলেও উর্দুভাষী এই পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্তা ব্যক্তিরা বলেন, ইমরান হায়দার ও নাঈমা ইমরানের এখন তেমন কোনো সমস্যা নেই। আইসিইউতে তাদের অভজার্ভেশনে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
পাকিস্তান হাইকমিশনে লাগা আগুনের বিষয়ে বাংলাদেশ ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের বারিধারা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা মনিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঘটনাস্থলে রওনা দিই। সেখানে যাওয়ার পর দেখি আগুন তেমন একটা বড় না। আমাদের তেমন কোনো ইক্যুইপমেন্টও ব্যবহার করা লাগেনি। ধোঁয়া বের করে দিয়ে আমরা চলে আসি। প্রাথমিকভাবে আমরা যাচাই-বাছাই করে যতোটুক বুঝতে পেরেছি, বাসার টিভি থেকে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে আগুনের সৃষ্টি হতে পারে। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কেরোসিন, পেট্রোল বা এ ধরনের তেমন কিছুই সেখানে ছিল না। আমরা যখন চলে আসি তখনও পাকিস্তানি হাইকমিশনার ও তার স্ত্রী সুস্থই ছিলেন। পরে হয়তো ধোঁয়ার কারণে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপতালে ভর্তি হয়েছেন।
