ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার সৌদি আরবে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে ইরান সরাসরি দেশটিতে হামলা চালালেও বর্তমানে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা রিয়াদে হামলা চালাচ্ছে।
এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে মুসলিম বিশ্বের দুই শক্তিশালী সামরিক দেশ পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুক্ত করেছে রিয়াদ। শুক্রবার (৭ আগস্ট) মক্কায় সৌদি আরবের সঙ্গে ন্যাটো ধাঁচের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।
দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতাকে এবার তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা জোটে রূপ দিয়েছে এই চুক্তি। এর আওতায় কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে এতদিন সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখা পাকিস্তান ও তুরস্কও প্রয়োজনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের বাইরে রিয়াদ নতুন একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় পেলো।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে ওয়াশিংটন তার তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় মিত্রদের কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সুরক্ষা দিতে পারবে- এ নিয়ে যখন প্রশ্ন বাড়ছে, তখনই নতুন এই জোট গড়ে উঠল।
চুক্তিটি সৌদি আরবের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকির বিরুদ্ধে সুন্নি নেতৃত্বাধীন একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক ফ্রন্টের বার্তাও দিচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরাইল তার সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে এবং প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান ও তুরস্ক- দুই দেশেরই ইরানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। ফলে যুদ্ধ যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, তা ঠেকানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে তাদের।
পাকিস্তানকে দেশটির উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী এবং ইরানের সঙ্গে স্পর্শকাতর সম্পর্কের বিষয়টি সামলাতে হয়। অন্যদিকে তুরস্ক ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে উভয় দেশের অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।
চলমান যুদ্ধে ইরান একাধিকবার সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবের ওপর ইরানের সরাসরি হামলা অনেকটাই কমে আসে। তবে ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই রিয়াদ ছিল অন্যতম সোচ্চার বিরোধী পক্ষ। ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ না নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। কিন্তু বিভিন্ন দিক থেকে দেশটির ওপর হামলা অব্যাহত থাকায় সৌদি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সহায়তায় ইরান-সমর্থিত ইরাকি ও ইয়েমেনি মিলিশিয়ারা সৌদি আরবে বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালাতে পারে। এমন আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে রিয়াদ।
এর আগে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এর জবাবে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ অবকাঠামোতে হামলা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি তেহরানের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অর্থাৎ, সৌদি আরবের ওপর আরেকটি বড় ধরনের হামলা হলে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও তুরস্কও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং ইরান-সৌদি সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিস্তৃত যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
