লিভারপুল ছেড়ে তুরস্কের ট্রাবজনস্পোরে নাম লেখানো নিয়ে অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে গেছে। প্রিমিয়ার লীগ থেকে সরাসরি তুর্কি সুপার লীগ- ক্যারিয়ারের এই বাঁকবদল অনেকের চোখেই বিশাল এক পতন। তবে মিসরীয় এই তারকার এই সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে আছে বেশ কিছু কারণ। গত সেপ্টেম্বরেই আসলে শুরু হয়েছিল সালাহর বিদায়ের প্রস্তুতি। চ্যাম্পিয়নস লীগে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে হারের ম্যাচে তাকে বসিয়ে রাখেন কোচ আর্নে স্লট। সেদিনই প্রথমবার আলেক্সান্ডার ইসাক, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, হুগো একিতিকে আর সালাহকে একসঙ্গে মাঠে দেখা যায়। যদিও তা ছিল মোটে ছয় মিনিটের জন্য। এরপর নভেম্বরে একাদশ থেকে পুরোপুরি বাদ পড়েন তিনি। সেই সালাহ যখন ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নেমে ভক্তদের ঢল আর উচ্ছ্বাসে ভেসে যান।
২০২৫ সালের গ্রীষ্মেও ২৯ গোল আর ১৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটান সালাহ। তখন ফ্রি থাকলে তুরস্কের চতুর্থ সেরা ক্লাবের চেয়ে অনেক বড় গন্তব্যই পেতেন তিনি। কিন্তু এক বছরেই ভাগ্য বদলে গেছে এমনভাবে যে, ট্রাবজনস্পোরের সতীর্থদের মধ্যে লিভারপুলের মানের কেউ নেই বললেই চলে। দলে আছেন বিশ্বকাপের সেরা গোলদাতা কেপ ভার্দের সিদনি লোপেজ কাব্রাল, গোলরক্ষক আন্দ্রে ওনানা আর সাউদাম্পটনে অল্প সময় কাটানো পল ওনুয়াচু। তুর্কি ফুটবলে টাকার জোয়ার বাড়ছে বলেই এমন সাইনিং সম্ভব হয়েছে। জানা গেছে, বছরে প্রায় সোয়া কোটি ইউরো বেতনে সালাহকে দলে ভেড়াচ্ছে ট্রাবজনস্পোর। এমন অঙ্ক দিয়ে ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মান কিংবা ইতালিয়ান ক্লাবগুলোকেও টেক্কা দিতে পারছে তারা। সুপার লীগে ইতিমধ্যেই খেলছেন ভিক্টর ওসিমেন, ইলকায় গুন্দোয়ান, লেরয় সানে, এদেরসন আর লেয়ানড্রো ত্রোসার্দের মতো তারকারা। তবে এদের মধ্যে কেবল ওসিমেনের বয়সই ত্রিশ এর নিচে। বাকিদের জন্য তুরস্ক যেন হয়ে উঠেছে বুড়ো তারকাদের এক লাভজনক আশ্রয়স্থল।
স্লটের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে নিজেকে অবহেলিত মনে করলেও লিভারপুলের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বড় ক্লাব সালাহকে দলে টানতে আগ্রহ দেখায়নি। তার অ্যাজেন্টরা পুরোনো ক্লাব রোমার সঙ্গেও কথা বলেছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু ইউরোপের অভিজাত কোনো ক্লাব থেকে প্রস্তাব না আসাটাই বলে দেয়, সেরা সময় বোধহয় পেছনেই ফেলে এসেছেন সালাহ। আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় তারকা হয়েও সৌদি প্রো লিগের পথে হাঁটেননি সালাহ। ২০২৩ সালে আল ইত্তিহাদ দেড়শ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল প্রস্তাব দিলেও কখনোই সেটা তার স্বপ্নের গন্তব্য মনে হয়নি। বিশেষত ইরান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। তুরস্ক মুসলিম দেশ, মিসরের কাছাকাছি। এসব বিবেচনাতেই হয়তো শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্পোর্টিং কানসাস সিটিও তাকে পেতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু দূরত্বের কারণে হিসাব মেলেনি।
তবে সালাহর সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহের কিছু নেই। এই মৌসুমেই মার্চে অ্যানফিল্ডে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক পনেরো মিনিটের প্রদর্শনী দেখিয়েছিলেন তিনি। গতবার লীগে তৃতীয় হওয়া ট্রাবজনস্পোরের এবার ইউরোপা লীগে খেলার কথা। তবে ফেরেন্তসভারোস বা গোর্নিক জাবজের বিপক্ষে প্লে-অফে হারলে নেমে যেতে হবে কনফারেন্স লীগে। লিভারপুল ছাড়ার আগে চুক্তির শেষ বছরের ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটা আর্থিক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্লাব বদলে তার বাণিজ্যিক আয়েও প্রভাব পড়বে। কারণ লিভারপুলের পরিচিতিই এত দিন তাকে এই সুবিধা এনে দিয়েছিল। স্লটের বিদায়ের পর আন্দোনি ইরাওলা দায়িত্ব নিলেও সালাহ প্রসঙ্গে অবস্থান বদলায়নি লিভারপুলের।
মৌসুম শেষের আগে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ড্রই ছিল ক্লাবটির হয়ে তার শেষ ম্যাচ। সালাহর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, তা লিভারপুল জানত অনেক আগে থেকেই। তবু এখনো তারা সেই জায়গা পূরণ করতে পারেনি। আরবি লাইপজিগের ইয়ান দিওমান্দেকে ১০ কোটি পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েও রাজি করাতে পারেনি। দিওমান্দে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ডেরায়। ফল দাঁড়িয়েছে এইÑসালাহ নতুন ঠিকানা পেয়ে গেছেন, লিভারপুল এখনো পায়নি তাদের নতুন সালাহ।
