সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব

বুড়িমারী স্থলবন্দর

সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব

ফন্ট সাইজ:

বুড়িমারী স্থলবন্দরে সরকার প্রতি বছর হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। ভারতীয় সরকারের বৈরী আচরণ। রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে ১৮টি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ। উন্নত অবকাঠামোর অভাব। আঁকাবাঁকা ভাঙাচোরা মহাসড়ক। বন্দরে ব্যবসায়ীদের গ্রুপিং। লোকসানে পড়ে আমদানিকারকরা অন্য বন্দরে যাওয়ায় অচল অবস্থা বিরাজ করছে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ১৯৮৮ সালে গড়ে উঠে স্থল শুল্ক স্টেশন। বুড়িমারী জিরো পয়েন্টে যাত্রা শুরু হলেও ২০১০ সালে চালু হয় স্থলবন্দরের পূর্ণাঙ্গ আমদানি-রপ্তানি। ভারত, ভুটান ও নেপাল তিন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য বন্দরটি গড়ে ওঠে। ২৭ বছর পূর্বে বছরে ১শ’ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব ছিল টার্গেট। নানা কারণে পূরণ হয়নি রাজস্ব টার্গেট। বন্দরটি চালু হওয়ায় এলাকার মানুষের পাল্টে যায় অর্থনৈতিক অবস্থার। প্রথমে সকল পণ্যের আমদানি চালু ছিল। প্রাণচাঞ্চল্য ছিল বন্দরে আমদানি-রপ্তানির। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টে ছিল ভরপুর। এই বন্দর থেকে সরকার শতকোটি টাকার উপরে রাজস্ব পেতো। বন্দর ঘিরে গড়ে উঠে বুড়িমারীতে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক ছিল কর্মব্যস্ত। বর্তমানে নানান কারণে বুড়িমারী বন্দরে অচল অবস্থা বিরাজ করছে। বন্দরটি এখন শুধু পাথরনির্ভর বন্দরে হয়েছে পরিণত। সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে ব্যবসায়ীরা জানায়, এর জন্য দায়ী ফ্যাসিস্ট সময়ের রাজস্ব বোর্ড। চালু ডুপ্লেক্স বোর্ড নিউজ প্রিন্ট, ক্রাফট পেপার, সিগারেট পেপারসহ সকল প্রকারের পেপার, গুঁড়া দুধ, টোব্যাকো কাঁচামাল আমদানি, রেডিও টিভি পার্টস্, সাইকেল পার্টস্, ফরমিকা শর্ট, সিরামিক ওয়্যার, স্যানিটারি ওয়ার, স্টেইনলেস স্টিল ওয়্যার, মার্বেল সøাব অ্যান্ড টাইলস, মিক্সড ফেরিন্সের মতো ১৮টি চালু পণ্য বুড়িমারী বন্দর দিয়ে আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রাজস্ব বোর্ডের পর থেকেই বন্দর অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, এ ছাড়াও রয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বৈরী আচরণ। বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত-ভুটান থেকে আমদানি হয় পাথর। ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় চাংরাবান্দার ব্যবসায়ীরা আকস্মিকভাবে পাথরের দাম বাড়িয়ে দেয়। আকস্মিক ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পাথরের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে বাংলাদেশি পাথর ব্যবসায়ীরা। পাথরের মূল্য না কমার কারণে বুড়িমারী বন্দরের ব্যবসায়ীরা ৩ মাস ধরে ভারত থেকে পাথর আমদানি বন্ধ রাখে। ভারত থেকে পাথর আমদানি বন্ধ রাখার কারণে বন্দরে ২০ হাজার পাথরনির্ভর শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। কাজ না পেয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রমিকরা। ভুটান থেকে বিনা শুল্ক আমদানিতে পাথর ভারতে এলেই ট্রাক অর্ধেক পাঠিয়ে দেয়। ভুটান থেকে একট্রাক পাথর আমদানির সময় ট্রাকচালকরা একটু বেশি পাথর নিয়ে আসতো। তাও বন্ধ করেছে ভারত। এতে বাংলাদেশি পাথর ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের অবকাঠামো ভালো না করায় ট্রাক এলে লেগে যায় পণ্য খালাসে জট। চালকদের ট্রাকে পণ্য খালাস করতে ৪/৭ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। পণ্য খালাস বিলম্বের কারণে সময়মতো পণ্য পাঠানো না হলে লোকসানে পড়ে ব্যবসায়ীরা। বন্দরের ব্যবসায়ী ইবনে সুমন ও আইয়ুব আলী লেবু জানান, বন্দরে রয়েছে ভাঙাচোরা সড়ক। ভাঙাচোরা সরু সড়ক থাকায় একটি আমদানি করা ট্রাক দাঁড় করালে অন্যটি থাকতে হয় অপেক্ষায়। বুড়িমারী-লালমনিরহাট সহাসড়ক ভাঙাচোরার কারণে ট্রাক উল্টে ও বিকল হয়ে পড়ে। লালমনিরহাট-বুড়িমারী ১শ’ কিলোমিটার মহাসড়কের অনেক স্থানে খানাখন্দরে ভরপুর। এ ছাড়াও বন্দরের অভ্যন্তরে নেই আধুনিক অবকাঠামো। বৃষ্টি এলে নষ্ট হয়ে যায় আমদানি পণ্য। বন্দরে দুইটি পণ্য ওজনের ওয়ে মেশিন থাকলেও তাও নষ্ট। নষ্ট ওয়ে মেশিনে পণ্য স্কেল করলে সঠিক ওজন না আসায় লোকসানে আমদানিকারকরা। বন্দরের ব্যবসায়ী জাকির সাদেক সওদাগর ও সফিয়ার রহমান জানালেন, লেনদেনের জন্য নেই পূর্ণাঙ্গ সোনালী ব্যাংকের কোনো শাখা। সোনালী ব্যাংকের শাখা না থাকার কারণে ১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে চালানের টাকা জমা দিতে হচ্ছে। বন্দরে পূর্ণাঙ্গ সোনালী ব্যাংকের শাখা স্থাপনের দাবি ব্যবসায়ীদের। ওদিকে দিনের অর্ধেক সময় থাকে না বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিকের জন্য স্থাপন করা জরুরি সাব-স্টেশন। বুড়িমারী স্থলবন্দর সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মাহমুদুল হাসান জানালেন, বন্দরটি উন্নয়নে ৬ শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে দ্রুত কাজ চালু হলে সমস্যার সমাধান হবে। বন্দরের কাস্টামস রাজস্ব কর্মকতা হারুন-অর-রশিদ জানালেন, বন্ধ রাখা ১৮ পণ্য আমদানি চালু, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন করলে ফিরে আসবে আমদানিকারকরা, বাড়বে বন্দরে রাজস্ব আদায়। লালমনিরহাট-১ পাটগ্রাম ও হাতিবান্ধা আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান জানান, সরকার সকল স্থলবন্দর ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারে ও রাজস্ব বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নানান পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। তাই বুড়িমারী স্থলবন্দর রাজস্ব আদায় বাড়াতে যত সমস্যা রয়েছে তা সরকার সমাধানের জন্য নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দ্রুত সম্ভব সমস্যার সমাধান করা হবে। বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক এএসএম নিয়াজ নাহিদ জানান, বন্ধ ১৮ পণ্য আমদানি উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ভারতের বৈরী আচরণ প্রত্যাহার, উন্নত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিক ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামো সমস্যা সমাধান হলে ফিরে আসবে বন্দরের প্রাণ। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক হোসেন সিন্টু জানান, সরকার এগিয়ে এলে এ বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব পাবে। রাজস্ব বোর্ডের বৈরী আচরণের কারণে রাজস্বে ধস নেমেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন