বৃটেনে আর্মি কলেজে ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র

বিবিসির অনুসন্ধান

বৃটেনে আর্মি কলেজে ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র

ফন্ট সাইজ:

বৃটেনের অন্যতম বৃহৎ সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজকে (এএফসি) ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত পাঁচ বছরে সেখানে প্রশিক্ষণ নেয়া অন্তত চার নারী অভিযোগ করেছেন, তারা ১৭ বছর বয়সে কলেজে থাকাকালে গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, গোপনে নজরদারি (ভয়্যারিজম) এবং নারীবিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।

তাদের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং কলেজটিতে যৌন সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা কিছু প্রশিক্ষকের আচরণে আরও উৎসাহিত হয়েছে। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বৃটেনের বৃহত্তম সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
উত্তর ইয়র্কশায়ারের হারোগেটে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজ বৃটেনের ১৯ বছরের কম বয়সী সেনা সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। সেনাবাহিনীর সব ১৬ বছর বয়সী নতুন রিক্রুটকে এখানেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বর্তমানে কলেজটিতে মোট ৮৮৯ জন রিক্রুটের মধ্যে অন্তত ৭০ জন নারী জুনিয়র সৈনিক রয়েছেন।

দেশটিতে এই অভিযোগগুলো এমন সময় সামনে এলো, যখন বৃটেনে প্রথম সরকারি জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ৬৭ শতাংশ নারী অন্তত একবার কোনো পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা সম্মতি ছাড়া যৌন হয়রানি বা যৌন আচরণের শিকার হয়েছেন।
বিবিসির অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজকে ঘিরে ১৬টি যৌন অপরাধের অভিযোগ পেয়েছে নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশ।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অশ্লীলভাবে নিজেকে প্রদর্শন, গোপনে নজরদারি (ভয়্যারিজম) এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনা। তবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া নথিতে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে বিচারের পর্যায়ে পৌঁছেছে কিনা, তা উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত কলেজটিতে অনুপযুক্ত যৌন আচরণের ১৭৬টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি ছিল স্থায়ী স্টাফদের বিরুদ্ধে এবং ১৪৪টি ছিল জুনিয়র সৈনিকদের বিরুদ্ধে।

‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে গণধর্ষণ করা হয়’
পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা টিলি জানান, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়, যখন কলেজে একাধিক সহপাঠী সৈনিক তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্ষণ করে।

তিনি বলেন, ওরা আমাকে বলেছিল, ‘রুমে আসবে?’ আমি তখন ১৭ বছরের সরল একটি মেয়ে। আমি রাজি হই। এরপর তারা আমার কাপড় খুলে ফেলে এবং আমার সম্মতি ছাড়াই নানা ধরনের যৌন নির্যাতন শুরু করে। তারা অনেকজন ছিল। আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করছিল, অশালীন মন্তব্য করছিল। আমাকে মেয়ে নয়, একটি বস্তু হিসেবে দেখছিল। পরে একই বয়সী একাধিক জুনিয়র সৈনিক আমাকে ধর্ষণ করে। এটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলেছিল। তখন নিজেকে যেন এক টুকরো মাংস মনে হচ্ছিল।
ঘটনার দুই সপ্তাহ পরই তিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে দেন।
তিনি বলেন, আমি সেখানে থাকতে পারিনি। মা আমাকে বলেছিলেন, চলে আসো। না হলে সবাই আমাকে সেই মেয়ে হিসেবেই চিনত, যে নাকি অনেকের সঙ্গে শুয়েছে। অথচ বাস্তবে তা ঘটেনি।

টিলির অভিযোগ, ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর এক প্রশিক্ষক অন্যদের কাছে তাকে নিয়ে বলেছিলেন, শুনেছ, সেই মেয়েটার কথা, যে এতগুলো ছেলের সঙ্গে শুয়েছে?
তার ভাষায়, একজন প্রশিক্ষকের কাছ থেকে এমন কথা শোনা ভয়াবহ। এতে ছেলেদের শেখানো হয় যে নারীরা শুধু একটি কাজের জন্যই আছে।
তিনি ঘটনাটি পুলিশের কাছে জানিয়েছিলেন। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি। পরে নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশের সঙ্গে তিনি আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছান, যদিও পুলিশ কোনো দায় স্বীকার করেনি।
আরেক ভুক্তভোগী মোনিকা (ছদ্মনাম) বলেন, এক সহকর্মী সৈনিক তাকে একটি কক্ষে আটকে যৌন নিপীড়ন করে।

তার ভাষায়, সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, যাতে আমি বের হতে না পারি। এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখে চুমু খেতে শুরু করে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করে। কোনোভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে সক্ষম হই।
পরে অন্য একটি স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। তিনি বলেন, সেই বিদায় ছিল তার জন্য “স্বস্তির”।
আরেক ভুক্তভোগী অ্যামির ঘটনা তুলে ধরেছেন তার মা শেরিল। তার দাবি, প্রশিক্ষণ চলাকালে অ্যামি প্রায় প্রতিদিনই যৌন হয়রানির শিকার হতেন। শেরিল বলেন, মেয়ের কক্ষের দরজার তালা নষ্ট থাকায় পুরুষ সৈনিকদের ঢোকা ঠেকাতে তাকে দরজার সামনে শুয়ে রাত কাটাতে হতো।

এছাড়া প্রশিক্ষকরাও তাকে নিয়মিত নারীবিদ্বেষী গালিগালাজ করতেন।
শেরিল বলেন, করিডরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে প্রশিক্ষকরা তাকে ‘বড় বেশ্যা’ বা ‘স্ল্যাপার’ বলে ডাকত। তারা বলত, ছেলেরা তার দিকে তাকায়, সেটাও নাকি তার দোষ। এমনও বলা হয়েছিল, প্রতি বছর একজন মেয়েকে ছেলেরা পছন্দ করে, মনে হচ্ছে এ বছর সেই মেয়েটি তুমি।
তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষ ভুলে যায় যে সে আসলে এখনো একটি শিশু।

যুক্তরাজ্যের আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী সবাইকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়।
চতুর্থ ভুক্তভোগী এলি জানান, কলেজের প্রথম সপ্তাহেই এক প্রশিক্ষক নতুন রিক্রুটদের বলেছিলেন, সবকিছুই নির্ভর করে কতটা নারীকে পাওয়া যায় তার ওপর। তার অভিযোগ, প্রশিক্ষকরা মেয়েদের সৌন্দর্য ১০-এর মধ্যে নম্বর দিতেন এবং দরজায় না নক করেই ডরমিটরিতে ঢুকে পড়তেন।
এলি বলেন, আমরা তখন শুধু অন্তর্বাস পরে থাকতাম। তারা দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তিনি বলেন, কলেজে যা দেখেছেন, তার পর সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছাই নষ্ট হয়ে যায়।

স্টাফদের বিরুদ্ধেও দণ্ডের নজির
গত পাঁচ বছরে কলেজটির একাধিক প্রশিক্ষক সামরিক আদালতে যৌন ও শারীরিক সহিংসতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২০২৩ সালে করপোরাল ড্যানিয়েল কনওয়ে ঘুমন্ত এক সহকর্মীকে ধর্ষণের দায়ে সাত বছরের বেশি কারাদণ্ড পান।
একই বছরে করপোরাল সাইমন বার্ট্রাম যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ মাসের সামরিক কারাদণ্ড পান। বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে বৃটিশ সেনাবাহিনী অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গুরুতর” বলে উল্লেখ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, অগ্রহণযোগ্য ও অপরাধমূলক আচরণের কোনো স্থানই আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নেই। মানুষ একটি ভালো ক্যারিয়ারের আশায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং সেনাবাহিনীর মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দেশটির সেনাবাহিনী আরও জানায়, যারা এ ধরনের যৌন নিপীড়ন বা অপরাধের শিকার হয়েছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের সামনে এসে অভিযোগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সহায়তায় ডিফেন্স সিরিয়াস ক্রাইম কমান্ড গঠনসহ বেশ কয়েকটি সংস্কার কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যাতে সেনাবাহিনীর নিয়মিত কমান্ড কাঠামোর বাইরে থেকেও তারা বিচারিক সহায়তা ও বিশেষায়িত সেবা পেতে পারেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন