ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার অংশীদারিত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনায় নিজের ‘ভুলের’ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ফিফার শীর্ষ নির্বাহীদের সমর্থন পাওয়ার পর তিনি সভাপতির পদে বহাল থাকছেন। ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ইনফান্তিনো বুধবার রাবাতে অবস্থিত ফিফার আফ্রিকা কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যদের জরুরি বৈঠকে ডাকেন। বৈঠক শেষ হওয়ার চার ঘণ্টা পরই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সপ্তাহান্তে জানায়, তারা ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। সংস্থাটি ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রস্তাবকে অস্বচ্ছ, গোপন কক্ষের চুক্তি বলে আখ্যা দেয়। সমালোচনা শুধু উয়েফা থেকেই নয়, ফিফার ভেতর থেকেও এসেছে। এর মধ্যে ছিলেন ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম। তিনি বুধবারের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন। মঙ্গলবার কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ স্মারকে তিনি লিখেছেন, পুরো পরিস্থিতি দুঃখজনক এবং নিন্দনীয় ঘটনাপ্রবাহ। তবে বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে গ্রাফস্ট্রম ও ব্যবস্থাপনা বোর্ড ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রম ফিফার সহ-সভাপতি, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে একটি যৌথ চিঠিও পাঠিয়েছেন, যা বিবিসি দেখেছে। সেখানে তারা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যেন এমন ভুল আর না হয় সে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈঠক শেষে দু’জনকে রাবাতে অনুষ্ঠিত উইমেন্স আফ্রিকা কাপ অব নেশনস-এর একটি ম্যাচ একসঙ্গে উপভোগ করতেও দেখা যায়।
ইনফান্তিনো আগে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)-এর মাধ্যমে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনায় সমর্থন দিলে প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি ডলার দেয়া হবে। ফিফা জানায়, বুধবারের বৈঠকে এফএফই-সংক্রান্ত ভুলগুলো স্বীকার করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে বলে মনে করানো তাদের উদ্দেশ্য ছিল না এবং বিষয়টি ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।
এছাড়া ফিফা স্বীকার করেছে, প্রস্তাবটি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পরও কিছু ভুল হয়েছে। গত ২৮ জুলাই দ্য টাইমস প্রথম ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করে। তবে একই সঙ্গে ফিফা জানিয়েছে, সংস্থার সততা, সুশাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের আক্রমণ আর সহ্য করা হবে না। নিজেদের নাম ও সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এর আগে দ্য টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মরক্কোর সমর্থনের বিনিময়ে ইনফান্তিনো দেশটিকে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফিফা এই দাবি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজিত ওই বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় হবে, সে সিদ্ধান্ত যথাসময়ে নেয়া হবে। ইনফান্তিনো আশা করছেন, এই সমর্থনের মাধ্যমে তার ১০ বছরের সভাপতিত্বের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটির ইতি টানা যাবে। কিন্তু ফিফার নির্বাহীদের এই সমর্থনের আগেই সুইস এই কর্মকর্তাকে ঘিরে আরও কঠোর সমালোচনা দেখা যায়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি, যার দেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে, তিনি বলেছেন তিনি আর ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা রাখেন না। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগালের সাবেক উইঙ্গার লুইস ফিগো অবিলম্বে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন। ফিগো বলেন, যে পদকে মর্যাদার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, ইনফান্তিনো সেটিকেই অবমূল্যায়ন করেছেন। নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য হয়তো এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু ফুটবলকে রক্ষার জন্য এখনো দেরি হয়নি। তবুও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো চতুর্থ মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
১৮ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রার্থিতা জমা দিতে পারবেন।
আর নির্বাচন হবে ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে। জিততে হলে ২১১ সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে ১০৬ ভোট পেতে হবে। তবে উয়েফা ভিন্ন পথ বেছে নিতে পারে। সপ্তাহান্তে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপেরও হুমকি দিয়েছে। এ সপ্তাহের শুরুতে ওয়েলসসহ কয়েকটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন তার পুনর্নির্বাচনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। ইংল্যান্ডও একই পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিফা আবারও বলেছে, ভুল হয়েছে ঠিকই, তবে যা করা হয়েছে সবই ফিফার বিধিমালার সম্পূর্ণ অনুসরণ করেই করা হয়েছে। সংস্থার মতে, বৈঠকের ফলাফল ফিফার সুশাসনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সংস্থার প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
