দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগের অনুসন্ধান যেন শেষই হয় না। দুদক বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধানের কাজ ৭৫ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। ফলে কয়েক হাজার অভিযোগের অনুসন্ধান বছরের পর বছর ঝুলে আছে। এতে দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন অনুসন্ধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুপারভিশন না থাকার কারণেই মূলত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান আটকে আছে।
চলতি মাস পর্যন্ত কতোগুলো অনুসন্ধান চলমান রয়েছে এর সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এ বিষয়ে দুদকের মুখপাত্র আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে জানান, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট ৫ হাজার ৬৬৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য ছিল। পূর্ববর্তী বছরসমূহের অনিষ্পন্ন অনুসন্ধানের সংখ্যা ৩ হাজার ১৮৫টি। এর মধ্যে সম্পন্নকৃত অনুসন্ধানের সংখ্যা ১ হাজার ৪০৯টি। বাকিগুলোর অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
কমিশন আইনের ২০(ক) ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হলে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে নতুন করে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করতে পারে কমিশন। আর ২০০৭ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালার ৭ বিধিতে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শেষ করতে না পারলে যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ করে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ১৫ দিন করে দুই দফা আরও ৩০ দিন সময় নিতে পারবেন বলে জানান দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান বিভাগের (তদন্ত-১) সাবেক পরিচালক রফিকুজ্জামান রুমি।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটই এই দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ। বর্তমানে একজন কর্মকর্তার হাতে গড়ে অন্তত ২৫-৩০টির বেশি অনুসন্ধান এবং একাধিক মামলার তদন্তের দায়িত্ব রয়েছেন। নতুন অভিযোগ নিয়মিত যুক্ত হওয়ায় একটি কাজে গুরুত্ব দিতে গেলে অন্যটি পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছে শুধু জনবল সংকট নয়, বিদ্যমান অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও দক্ষতারও অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন। এ বিষয়ে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মইদুল ইাসলাম মানবজমিনকে বলেন, অনুসন্ধান-তদন্ত আটকে থাকার মূল কারণ হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপরে ঊর্ধ্বতনের সুপারভিশন থাকে না বললেই চলে। একটি অভিযোগ অনুসন্ধান কিংবা মামলার দায়িত্ব দেয়ার পর তদারকি করা হয় না বললেই চলে। একটি ছোট্ট অনুসন্ধানও দীর্ঘ সময় পার করার নজির রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, তার কাছে ৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বেশ কিছু মামলার তদন্ত রয়েছে। একই ধরনের চাপ প্রায় সব কর্মকর্তার ওপরই রয়েছে। ফলে সময়মতো প্রতিবেদন জমা দেয়া সম্ভব হয় না।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে অনুসন্ধান বিলম্বিত হওয়ার পেছনে দক্ষ জনবলের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতা বা রাজনৈতিক চাপও ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, বিদ্যমান জনবলকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এবং অভিযোগ বাছাই করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
গোল্ডেন ভিসা অনুসন্ধানও তিন বছর ধরে ঝুলে:
দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসার মাধ্যমে সম্পদ কেনার অভিযোগে ৪৫৯ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানও তিন বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তি দুবাইয়ে ৯৭২টি সম্পত্তি কিনেছেন। দুদক এখন পর্যন্ত ৯২ থেকে ৯৬ জনকে শনাক্ত করেছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ জনকে ভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে তথ্য চাওয়া হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট দুবাইয়ে সম্পদ কেনার অভিযোগ তদন্তে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর একই বছরের এপ্রিলে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ বাংলাদেশির মালিকানায় দুবাইয়ে ৯৭২টি আবাসন সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। কাগজে-কলমে এসব সম্পদের মূল্য প্রায় ৩১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার হলেও প্রকৃত মূল্য আরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঝুলে আছে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তার অনুসন্ধান:
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক (বর্তমান দায়িত্ব) এ কে এম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি না পাওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রমও ধীরগতির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর উপ-পরিচালক (তদন্ত) মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। পরে এই অভিযোগের অনুসন্ধান অন্য একটি অনুসন্ধান টিমকে দেয়া হয়। এই টিমের একজন জানান, নথি চেয়ে বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিছু নথি পাওয়া গেছে। কিছু এখনো বাকি আছে।
দুদক বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (প্রশাসন) বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে ২০১৯ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর এবং ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও নথি চায়। ওই সময় আরিফ উদ্দিন এই দুই নদীবন্দরের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া আরিফ উদ্দিন বিআইডব্লিউটিএতে যোগদানের পর থেকে চলতি বছরের ৩০শে জুন পর্যন্ত তার বেতন-ভাতা, দায়িত্ব অর্পণসংক্রান্ত অফিস আদেশ এবং তার, তার স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার রাখার আবেদন ও অনুমোদনের সব তথ্যও চাওয়া হয়। দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তদন্তের স্বার্থে প্রথম দফায় বিআইডব্লিউটিএকে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। পরে দ্বিতীয় দফায় আবারো চিঠি দিয়ে সব তথ্য ও নথি পাঠাতে বলা হয়।
২০১২ সালের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি:
দুদক অনুসন্ধানে ধীরগতির আরেকটি হচ্ছে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রফিকুল আমিনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। ২০১২ সালে শুরু হওয়া অনুসন্ধান ২০২৬ সালেও শেষ হয়নি। প্রায় ১৪ বছর পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে থাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই এ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য তাকে তলব করা হয়েছিল। হাজির হয়ে তিনি নিজের বক্তব্য দিয়েছেন, যা রেকর্ড করা হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ২০১২ সালে রফিকুল আমিনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়। দীর্ঘ সময় কার্যত স্থবির থাকার পর সম্প্রতি সেই অনুসন্ধান আবার সক্রিয় করা হয়েছে। একই অভিযোগে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের সাবেক পরিচালক গোফরানুল হক ও তৈয়বুর রহমানকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হলেও তারা নির্ধারিত দিনে দুদকে হাজির হননি বলে জানা গেছে।
