শুরুটা হয়েছিল চব্বিশের জুলাইতে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। হাসিনা সরকার মানুষের মনের ভাষা প্রকাশ করতেও বাধা দেয়। বন্ধ করে দেয় ইন্টারনেট সেবা। তখন মানুষের মনের ভাব প্রকাশের বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে পথে দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চল দেয়াল। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেয়ালে দেয়ালে ফুটে ওঠে মানুষের চাপা ক্ষোভ ও দাবি- দাওয়ার নানা স্লোগান। ওই বছরের ৫ই আগস্টে সরকার পতনের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অলিগলির দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মের ভাবপ্রকাশ, ক্ষোভ, প্রতিরোধ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের ক্যানভাস। নিজেদের চাওয়া, সমাজের পরিবর্তন, রাষ্ট্র সংস্কার, আইন-আদালতের পরিবর্তন চাওয়াগুলো নজর কেড়েছিল সবার।
কেবল প্রতিবাদ নয়, এই দেয়ালগুলোতে স্থান পেয়েছিল একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন। ছাত্র-জনতা মিলে লাল-সবুজের নতুন স্বাধীনতার আবহ ফুটিয়ে তুলেছিল। আজ গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর। প্রশ্ন উঠেছে এই দুই বছরে মানুষের আকাঙ্ক্ষা কতোটুকু পূরণ হয়েছে? নাকি শুধুমাত্র দেয়াল লিখনেই সীমাবদ্ধ?
সরজমিন দেখা যায়, দেয়াল-পিলারের মধ্যে গ্রাফিতি ও লেখাগুলো ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে লেখাগুলো উঠে যাচ্ছে। বেশির ভাগ লেখা ও গ্রাফিতির উপরে ছেয়ে গেছে পোস্টার আর ফেস্টুনে। রাজনৈতিক পোস্টার, বিভিন্ন প্রচারণামূলক পোস্টার লাগানো হয়েছে লেখাগুলোর উপরে। বিভিন্ন স্থানে লেখাগুলোর উপর আরও লিখে বিকৃত করা হয়েছে। অনেক স্থানে কালি দিয়ে লেখাগুলো ঢেকে দেয়া হয়েছে।
এখনো মানুষ চলাচলের সময় লেখাগুলোর দিকে তাকান। অতীতের স্মৃতিগুলো ফিরে পান। অনেকে মনে করেন এসব মানুষকে পথবিচ্যুত হতে দেয় না। তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক নানা টানাপড়েন দেখে অনেকের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও কাজ করছে। তাদের মতে, দেয়ালে যে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন আঁকা হয়েছিল। বাস্তবে তার পূর্ণ প্রতিফলন হয়নি।
কি লেখা হয়েছিল?
সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে মানুষ ব্যবহার করে দেয়াল ও পিলারগুলোকে। সেখানে তারা নিজেদের প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরেন। এর মধ্যে অন্যতম- ‘রক্তাক্ত জুলাই’, ‘না স্বৈরাতন্ত্র, না রাজতন্ত্র, চাই গণতন্ত্র’ ‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কতো প্রাণ হলো বলিদান’, ‘রাষ্ট্র সংস্কার চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’, ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’, ‘আমার ভাই মরলো কেন? খুনি হাসিনা জবাব দে’, ‘চাই বিবেকের সংস্কার, চাই জাতির সংস্কার’, ‘মোরা একটি বৃন্তে দু’টি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান’, ‘বিজয় আসবেই’, ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’, ‘যদি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ’, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন?’, ‘সেভ দ্য কান্ট্রি জয়েন দ্য ফাইট’, ‘একদিকে নাটক করে অন্যদিকে গুম করে’, ‘৫২ দেখিনি ২৪ দেখেছি’, ‘সম্পদের হিসাব পরে, লাশের হিসাব আগে’, ‘হামার বেটাক মারলু ক্যান’ ইত্যাদি লেখা হয়।
যা বলছে সাধারণ মানুষ: এখনো পথচারীরা দেয়ালের লেখাগুলো দেখেন। তারা এসব দেখে অতীতের স্মৃতিতে ফিরে যান। তারা এসব দেখে অনুপ্রেরণা পান। এসব শুধু লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অনেকে কষ্টও পান। অনেক সচেতন নাগরিক মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও অযত্নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন নষ্ট বা মলিন হয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন বা পোস্টারের নিচে তা ঢাকা পড়ে গেছে। অনেকে এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান। সাব্বির আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থী মানবজমিনকে বলেন, চলাচলের সময় লেখাগুলো দেখি। এসব আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। লেখাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে পোস্টার লাগিয়ে রেখেছেন। এসব সংরক্ষণ করা উচিত। রাইসুল আহমেদ নামের এক যুবক বলেন, জুলাইয়ের দেয়াল লিখন সাধারণ কোনো লেখা না। এসব ছিল মানুষের মনের ভাব। মানুষ কি চায়, কি চায় না তা প্রকাশ করে দেয়াল লিখনের মাধ্যমে। ভেবেছিলাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তন আসবে। শুধু ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে এটিই আমাদের অর্জন। আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো আগের মতোই আছে।
রিয়াদ হোসেন নামের এক যুবক বলেন, স্বৈরাচারী শাসন ও চাতুর্যের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রং-তুলি নিয়ে নেমে পড়েছিল রাজপথের দেয়ালে। এতে ফ্যাসিবাদের পতন, সরকারের দমন-পীড়ন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার ফুটে ওঠে। কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াগুলো ফিকে হয়ে রয়েছে। এখনো সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য রয়ে গেছে। আমরা বৈষম্য দূর করতে পারিনি। কিন্তু আন্দোলন ছিলই বৈষম্যের বিরুদ্ধে। খাইরুল ইসলাম নামে এক রিকশাচালক বলেন, দিন শেষে আমরা সব থেকে বঞ্চিত। হাসপাতালে গেলে বেড পাই না। সরকারি অফিসে গেলে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। আমরা তো এমনটা চাইনি। আমরা গরিব মানুষ। নিজেদের অধিকারটুকু শুধুমাত্র সম্মানের সঙ্গে পেতে চেয়েছিলাম।
