আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)কে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দুই কোটি টাকার অনুদান নিয়ে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসায় আবাসন খাত এবং ক্রেতাদের মধ্যে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সবমিলিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের সূত্রপাত:
রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসসহ পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্য ২৬শে জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক বরাবর একটি আবেদন করেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ২ কোটি টাকার আর্থিক অনুদান দেয়া সহ ১২টি বিষয়ে অভিযোগ করা হয়। তাদের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে বোর্ডের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গত ৩০শে জুলাই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে অধিকতর পর্যবেক্ষণ সময় সাপেক্ষ বিধায় ১লা আগস্টের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত করে নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রিহ্যাব সভাপতিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপর রিহ্যাব-এর কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। তবে বর্তমান নেতৃত্বের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদানসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে নেয়া হয়েছে এবং অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
১৬ পরিচালকের পাল্টা অবস্থান:
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দিয়ে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নেন ১৬ জন নির্বাচিত পরিচালক। তাদের দাবি, দ্বিতীয় বোর্ড সভায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। যদিও সেখানে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়সূচি আকস্মিকভাবে নির্ধারিত হওয়ায় নতুন বোর্ড সভা আহ্বানের সুযোগ ছিল না। ফলে দ্বিতীয় বোর্ড সভার নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে ২ কোটি টাকার চেক প্রদান করা হয়। (২য় বোর্ড সভার একটি কপির ১২নং পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে)। ১৬ জন পরিচালকদের দাবি, যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়ার বিষয়টি ২য় বোর্ড মিটিংয়ে পাশ করা ছিল, আর টাকার পরিমাণটা ভাইস প্রেসিডেন্টরা আলোচনা করে নির্ধারণ করেছেন। এজন্য প্রেসিডেন্টের এই কাজকে কোনো মতেই অনিয়ম বলা যায় না। এ ছাড়া বিধি অনুযায়ী পোস্ট ফ্যাক্টো অনুমোদন নেয়ার সুয়োগ রয়েছে। তাদের মতে, যারা অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন তারা বারবার ‘২ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয়’ হওয়ার কথা বললেও, একবারও উল্লেখ করছেন না যে অর্থটি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা নিয়েও রাজনীতি শুরু করেছে।
যে কারণে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ালো:
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সকল ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকদের নেয়া হলো না কেন? এ নিয়ে কারও কারও মাঝে রাগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ সহ ৫ জনের তালিকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তিনি বাদে মাত্র ২ জনকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। ভবিষ্যতে মতপার্থক্য নিরসনে কী উদ্যোগ নেয়া হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে রিহ্যাবের সভাপতি বলেন, আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। নির্বাচনের পর সবাইকে নিয়েই সংগঠন পরিচালনা শুরু করেছি। গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর চেয়ারম্যান অভিযোগকারীদের দিয়েই গঠন করা হয়েছে। আবাসন খাত বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই পারস্পরিক মতপার্থক্য বা ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেই এগিয়ে নিতে চাই। তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং আবাসন শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। এ জন্য পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্য, সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।
আলী আফজাল বলেন, যতগুলো কাজ হয়েছে তার সবক’টি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ওই অর্থ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে যেসব স্ট্যান্ডিং কমিটি করা হয়েছে সেগুলোও পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদনক্রমে করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন কমিটি গত তিন মাসে যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে তার সব তথ্য প্রমাণ আছে। শুনানিতে তথ্য-প্রমাণসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
সমস্যাগুলোর বিষয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরীণভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়া সঠিক হয়নি বলে মনে করেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্য তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন। এতে রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো মতপার্থক্য বা অভিযোগ থাকলে তা প্রথমে বোর্ডের ভেতরে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত ছিল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তার ভিত্তিতে তদন্ত করা হবে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তারপর তাদের সুপারিশে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়া হয়েছে এটা ঠিক। আমরা দুই পক্ষকে বসে সমাধান করার জন্য বলেছি।
অভিযোগকারী রিহ্যাবের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বলেন, বর্তমান সমস্যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে না গিয়ে সংগঠনের ভেতরে বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতো। এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই পড়বে। এই খাতের নেতাদের এগুলো নিয়ে আলোচনা করা ভালো।
