শহীদ রাজুর পরিবারে ঘুচবে কবে অন্ধকার

শহীদ রাজুর পরিবারে ঘুচবে কবে অন্ধকার

ফন্ট সাইজ:

জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিতে নিহত সৈয়দ গোলাম মোস্তফা রাজু (৩৫) চলে যাওয়ার দুই বছর পেরিয়েছে। এরমধ্যে মারা গেছেন তার মা। স্ত্রী আকলিমা আক্তার তিন সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছেন। অপেক্ষায় আছেন একটি সরকারি চাকরির। তিনি বলেন, মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। আমার স্বামী আমাকে পড়িয়েছে। চাকরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে রাজি ছিল না। বলতো আমি তোমার স্বামী। আমি থাকতে তুমি কেন চাকরি করবা? আমি কষ্ট করে হলেও তোমাদের খাওয়াবো। হেলথে আমার চাকরি হয়েছিল তখনো উনি করতে দেয় নাই। আজ মানুষটা নাই দুই বছর হলো। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ২০শে জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লায় ক্যানেলপাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান মোটর মেকানিক্স সৈয়দ গোলাম মোস্তফা রাজু। অন্ধকার নেমে আসে রাজুর পরিবারে। নিহত রাজুর তিন সন্তান সৈয়দা আয়শা সিদ্দিকা (১৫), ছেলে সৈয়দ রাইয়ান আবদুল্লাহ (১৩) ও ছোট ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (৭)। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিল রাজু। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ১ নং কাঞ্চনপুর এলাকায়। সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লায় জনৈক সোরওয়ার্দীর বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভাড়ায় বসবাস করতেন তিনি। গত ২২ বছর ধরে রাজু ওই এলাকায় ছিলেন। মোটর মেকানিকের পাশাপাশি পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন তিনি। আকলিমা আক্তার জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের কারণে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। নির্বাচন শেষ হয়ে নতুন সরকার এসেছে। নতুন করে আবারো সিভি নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দাবি জানিয়েছিলাম জুলাই শহীদ পরিবার থেকে যোগ্যতাসম্পন্নদের যেন সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। এখন অপেক্ষায় আছি। দেখি উনারা কী করেন। তিনি আরও বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন সন্তানকে নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে যাই। কীভাবে সংবার চলবে, কীভাবে তাদের লেখা-পড়া, ঘরভাড়া সব মিলিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। পরে আমার স্বামী জুলাই শহীদের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও এককালীন অনুদান পেয়েছি। আকলিমা বলেন, তিন ছেলে-মেয়ে মাদ্রাসায় লেখা-পড়া করছে। ছেলেটা গ্রামের বাড়িতে একটি মাদ্রাসায় পড়ছে। সেখানে কোনো বেতন লাগে না। আর বড় মেয়ে ও ছোট ছেলে সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লায় কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে। স্বামীকে নিয়ে যে বাসায় ভাড়া থাকতাম সেখানেই আছি। জুলাই আন্দোলনের সময় আমার স্বামী গুলি খেয়ে মারা গেছে। আমি চাই তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। জুলাইয়ের ঘটনাটা আজকে আপনাদের কাছে দুই বছর মনে হচ্ছে।

কিন্তু আমাদের কাছে দুই বছর মনে হয় না। মনে হচ্ছে কালকে ঘটনাটা ঘটেছে। আমরা যারা স্বজন হারিয়েছি যতদিন বেঁচে থাকবো আমাদের এবং আমাদের ছেলে-মেয়ের চোখের সামনে ঘটনাটা ভেসে উঠবে। প্রতিদিন এর চেতনা আমাদের মনের মধ্যে বিচরণ করে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে গুলি করে যেভাবে নির্মমভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, এই জুলাইয়ের বিচার যদি না হয় আগামী সরকার স্বৈরাচার হয়ে উঠতে সময় লাগবে না। আর জুলাইয়ের যদি বিচার করা হয় তাহলে আগামীতে সরকার দেশের মানুষের ক্ষতি করতে তিনবার ভাববে। আকলিমা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা সব সময় বলে আসছি, আমাদের মৌলিক চাহিদার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। তরে এর চেয়ে বড় চাহিদা হচ্ছে স্বামী হত্যার যেন সঠিক বিচার পাই।

সেদিনের ঘটনা মনে করতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০ জুলাই দুপুরে কথা হয় রাজুর সঙ্গে। বিকাল সাড়ে তিনটা কি পৌনে ৪টায় দুপুরের খাবার খেতে বাসায় আসে রাজু। কয়েকদিন ধরেই চিটাগাং রোডের অবস্থা ভালো না। খাবার খাওয়ার সময়ই আমাদের বাসার জানালা দিয়ে দেখা যায় একটি মার্কেটে আগুন। তখন রাজু খাবার শেষ করে ছাদে যায় দেখতে। আমরা ভাড়াটিয়ারাও কয়েকবার গিয়েছি ছাদে দেখতে। পরে রাজু ছাদ থেকে দেখেন নিচে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে মার্কেটের আগুন দেখছে। তখন নিচে নেমে সেও আগুন দেখতে যায়। কিছুক্ষণ পরেই এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়। অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। রাজু আহত একজনকে ধরতে গেছে। এমন সময় তার মাথায় গুলি লাগে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ওইদিনই মাথায় অস্ত্রোপচার করার পর অবস্থার অবনতি ঘটলে পরদিন ২১শে জুলাই মারা যান রাজু।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন